পদার্থ বিজ্ঞান

তরঙ্গ কাকে বলে? তরঙ্গ কত প্রকার ও কি কি?

1 min read

তরঙ্গ কাকে বলে

আমরা সকলেই জেনে বা না জেনে  তরঙ্গের সাথে পরিচিত বা তরঙ্গ দেখেছি। যখন পানিতে কোনো ঢিল ছুড়া হয় তখন সেই আঘাত থেকে পানির কনাগুলো আন্দোলিত হয় এবং তরঙ্গের সৃষ্টি হয়ে তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

এছাড়াও আমরা যখন ঘরে  বিদ্যুৎ এর লাইন অন করি তখন বিদ্যুৎ এর ফলে আলোর সৃষ্টি হয় এবং সেই আলো  ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, সেটাও  একপ্রকার তরঙ্গ।

আমরা যখন কথা বলি সেই কথার কম্পন বা  শব্দটা  যখন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে, সেখানেও তরঙ্গের সৃষ্টি হয়।

একটা স্প্রিংকে সংকুচিত করে  তা আবার ছেড়ে দিলে তার ভিতর দিয়ে যে বিচ্যুতিটি ছুড়ে যায় সেটাও তরঙ্গ।

সুতরাং এটা বলা যেতে পারে যে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা সকলেই তরঙ্গ উপলদ্ধি করতে পারি এবং তা সহজেই বর্ণনা ও করতে পারি। তবে তা সুশীল ও সাবলীল ভাষায় উপস্থাপন করা জরুরি। আর আজকের আর্টিকেলে আমরা তাই নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করবো।  তাহলে চলুন শুরু করা যাক।

তরঙ্গের সংজ্ঞা

যে পর্যাবৃত্ত আন্দোলন কোন জড় মাধ্যমের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে শক্তি সঞ্চারিত করে কিন্তু মাধ্যমের কণাগুলোকে স্থানান্তরিত বা স্থানচ্যুতি করে না তাকে তরঙ্গ বলে।

যেমন – তড়িৎ চুম্বক , মহাকর্ষীয় ,পানি ইত্যাদি।

তরঙ্গ কত প্রকার ও কী কী?

তরঙ্গ প্রবাহের দিক এবং মাধ্যমের কণাগুলোর কম্পনের দিক এর  ওপর ভিত্তি করে তরঙ্গকে প্রধানত ২ ভাগে ভাগ করা যায়।  যথা–

১। অনুপ্রস্থ তরঙ্গ এবং

২। অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ

অনুপ্রস্থ তরঙ্গ কাকে বলে:

যে তরঙ্গ কম্পনের দিকের সাথে লম্বভাবে অর্থ্যাৎ ৯০° কোণে অগ্রসর হয় তাকে অনুপ্রস্থ তরঙ্গ বলে।  যেমন- পানির তরঙ্গ একধরনের  অনুপ্রস্থ তরঙ্গ।

অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ কাকে বলে:

যে তরঙ্গ কম্পনের দিকের সাথে সমান্তরালভাবে অর্থ্যাৎ ১৮০° কোণে অগ্রসর হয় তবে তাকে অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ বলে। যেমন- বায়ু মাধ্যমে শব্দের তরঙ্গ  একধরনের অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ।

অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ ও অনুপ্রস্থ তরঙ্গের মধ্যে পার্থক্য কি?

অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ-

১।অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গে তরঙ্গ সঞ্চালনের দিক মাধ্যমের কণাগুলোর স্পন্দনের দিকের সাথে সমান্তরালে থাকে।

২। অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে তরঙ্গ সঞ্চালিত হয়।

৩। একটি সংকোচন ও একটি প্রসারণ নিয়ে তরঙ্গদৈর্ঘ্য গঠিত।

৪। অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের উদাহরণ- স্প্রিং তরঙ্গ, শব্দ তরঙ্গ ইত্যাদি।

অনুপ্রস্থ তরঙ্গ-

১। যে তরঙ্গের সঞ্চালনের দিক মাধ্যমের কণাগুলোর স্পন্দনের দিকের সাথে সমকোণে থাকে তাকে অনুপ্রস্থ তরঙ্গ বলে।

২।এটি  মাধ্যমে তরঙ্গশীর্ষ ও তরঙ্গপাদ উৎপন্ন করে সঞ্চালিত হয়।

৩। একটি তরঙ্গশীর্ষ ও একটি তরঙ্গপাদ নিয়ে তরঙ্গদৈর্ঘ্য গঠিত।

৪। অনুপ্রস্থ তরঙ্গের উদাহরণ- পানির তরঙ্গ, আলোক তরঙ্গ ইত্যাদি।

তরঙ্গের বৈশিষ্ট্য-

(১) বিভিন্ন মাধ্যমের কণাগুলোর স্পন্দন গতির ফলে তরঙ্গ সৃষ্টি হয় কিন্তু কণাগুলো স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হয় না।

(২)  তরঙ্গ সঞ্চালনের জন্য মাধ্যমের প্রয়োজন।

(৩) তরঙ্গের বেগ মাধ্যমের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে।

(৪) তরঙ্গ একস্থান থেকে অন্যস্থানে শক্তি সঞ্চালন করে থাকে।

(৫) তরঙ্গের প্রতিফলন, প্রতিসরণ ও উপরিপাতন ঘটে।

(৬) তরঙ্গের বিস্তার,কম্পন ও তরঙ্গদৈর্ঘ্য আছে।

(৭) সকল তরঙ্গই শক্তি ও তথ্য সঞ্চারণ করতে পারে।

(৮) তরঙ্গ অগ্রগামী বা স্থির হতে পারে।

(৯) তরঙ্গ প্রবাহের দিক রয়েছে।

তরঙ্গ সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন-

পূর্ণ দোলন (Complete oscillation) কাকে বলে: সরল ছন্দিত স্পন্দন সম্পন্ন কোনো বস্তু একটি নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে যাত্রা শুরু করে একই নিয়মে একটি নির্দিষ্ট পথ আবর্তন করে আবার ঐ বিন্দুতে ফিরে এলে তাকে পূর্ণ দোলন বলে।

পর্যায়কাল (Time period) কাকে বলে : পর্যাবৃত্ত গতি সম্পন্ন কোন বস্তুর একটি পূর্ণ কম্পন বা একটি সম্পূর্ন পর্যায় সম্পন্ন করতে যে সময় লাগে তাকে পর্যায়কাল বলে।

 কম্পাঙ্ক (Frequency) কাকে বলে : তরঙ্গস্থিত স্পন্দিত একটি বস্তু প্রতি সেকেন্ডে যতগুলো পূর্ণ তরঙ্গের সৃষ্টি হয় তাকে তরঙ্গের কম্পাঙ্ক বলে।

বিস্তার (Amplitude) কাকে বলে : তরঙ্গস্থিত স্পন্দিত একটি বস্তু কণার সাম্যাবস্থান থেকে পরিমাপিত যেকোন এক দিকের সর্বাধিক সরণকে ঐ তরঙ্গের বিস্তার বলে।

 দশা (Phase) কাকে বলে : তরঙ্গ সঞ্চালনকারী কোনো কণার যেকোনো মুহূর্তের গতির সম্যক অবস্থানকে তার দশা বলে।

 আদি দশা : তরঙ্গস্থিত স্পন্দিত একটি বস্তুকণার সময় পরিমাপ শুরুর পূর্বের দশাকে তরঙ্গের আদি দশা বলে।

 তরঙ্গ বেগ (Wave Velocity)কাকে বলে : নির্দিষ্ট দিকে তরঙ্গ একক সময়ে যে দূরত্ব অতিক্রম করে থাকে তাকে তরঙ্গ বেগ বলে।

 তরঙ্গদৈর্ঘ্য (Wave length) কাকে বলে : তরঙ্গস্থিত স্পন্দিত একটি বস্তুকণা যে সময়ে একটি পূর্ণ কম্পন সম্পন্ন করে তরঙ্গ সে সময়ে যে দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে ঐ তরঙ্গের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বলে।

 তরঙ্গ মুখ (Wave front) কাকে বলে : তরঙ্গস্থিত সমদশাসম্পন্ন বস্তুকণাগুলো যে তলে অবস্থান করে তাকে তরঙ্গের তরঙ্গমুখ বলে।

তরঙ্গ কাকে বলে

অনুধাবনমূলক প্রশ্ন-

১। অনুপ্রস্থ তরঙ্গের কণাগুলো পর্যায়বৃত্ত গতিসম্পন্ন- ব্যাখ্যা কর। 

উত্তরঃ স্বভাবতই পানির ঢেউ তরঙ্গ শীর্ষ এবং তরঙ্গপাদ সৃষ্টি করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। এই তরঙ্গের উপরিস্থিত কণাগুলোর স্পন্দন পর্যায়বৃত্ত গতির সবগুলো বৈশিষ্ট্য বহন করে। অর্থ্যাৎ কণাগুলো পর্যায়কালে অর্ধেক সময়ে যে দিকে চলে, বাকি অর্ধেক সময় তার বিপরীত দিকে চলে। অর্থাৎ, অনুপ্রস্থ তরঙ্গের কণাগুলো পর্যায়বৃত্ত গতিসম্পন্ন হয়।

২। তরঙ্গশীর্ষ এবং তরঙ্গপাদ সমদশা সম্পন্ন নয় কেন?

উত্তরঃ তরঙ্গশীর্ষ এবং তরঙ্গপাদে অবস্থিত কণাগুলোর সার্বিক অবস্থা এক নয় এর ফলে তাদের দশাও এক নয়। কারণ, তরঙ্গশীর্ষ এবং তরঙ্গপাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব (λ/2), ফলে তাদের মধ্যে দশা পার্থক্য হয় ১৮০°। যদি তরঙ্গের উপরস্থিত দুটি কণার মধ্যে দশা পার্থক্য ১৮০° হয় তবে তাদেরকে বিপরীত দশা সম্পন্ন কণা বলে। এই কারণে তরঙ্গশীর্ষ এবং তরঙ্গপাদ সমদশা সম্পন্ন নয়।

৩। তরঙ্গ কাকে বলে এবং শব্দ এক প্রকার তরঙ্গ কেন? ব্যাখ্যা কর।

উত্তরঃ বস্তুর কম্পনের ফলে শব্দ তৈরী হয়। বস্তুর এই কম্পন মাধ্যমের কণাগুলোকে পর্যায়বৃত্ত গতিতে স্পন্দিন করে। আমরা জানি, মাধ্যমের কণাগুলোর পর্যায়বৃত্ত স্পন্দনের ফলে তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। যেহেতু শব্দ সৃষ্টি এবং এর সঞ্চালনের ফলে মাধ্যমের কণাগুলো পর্যাবৃত্ত স্পন্দন লাভ করে, তাই শব্দ এক প্রকার তরঙ্গ।

বহুনির্বাচনি প্রশ্নোত্তর –

১। কোন গতি বৃত্তাকার, উপবৃত্তাকার বা সরলরৈখিক হতে পারে?

ক) রৈখিক গতি

খ) চলন গতি

গ) ঘূর্ণন গতি

ঘ) পর্যায়বৃত্ত গতি

উত্তরঃ ঘ

২। অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ কম্পনের দিকের সাথে কিভাবে অগ্রসর হয়?

ক) সমকোণে

খ) সমান্তরালে

গ) 45° কোণে

ঘ) 100° কোণে

উত্তরঃ খ

৩। স্পন্দন গতির দিক কয় মুখী?

ক) ১

খ) ২

গ) ৩

ঘ) ৪

উত্তরঃ খ

৪। অসম বেগে গতিশীল বৈদ্যুতিক পাখার গতি কি রকম?

ক) উপবৃত্তাকার গতি

খ) পর্যায়বৃত্ত গতি

গ) ঘূর্ণন গতি

ঘ) চলন গতি

উত্তরঃ গ

৫। কোনটি যান্ত্রিক তরঙ্গ?

ক) আলোক তরঙ্গ

খ) তাপ তরঙ্গ

গ) শব্দ তরঙ্গ

ঘ) চৌম্বক তরঙ্গ

উত্তরঃ গ

তো এই হচ্ছে আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় তরঙ্গ কাকে বলে এবং তরঙ্গের প্রকারভেদ সম্বন্ধীয় যাবতীয় প্রশ্ন ও উত্তর।

তাই আমরা আশা করছি যে আজকে আপনাদের তরঙ্গ কাকে বলে এবং প্রকারভেদ নিয়ে পূর্ণ ধারনা দিতে পেরেছি। ধন্যবাদ।

Rate this post
Mithu Khan

I am a blogger and educator with a passion for sharing knowledge and insights with others. I am currently studying for my honors degree in mathematics at Govt. Edward College, Pabna.