রকেটে জ্বালানি হিসেবে লিকুইড হাইড্রোজেন ও লিকুইড অক্সিজেন ব্যবহার করা হয়।

শুষ্ক জ্বালানী চালিত রকেট এবং মিশ্রিত জ্বালানী :
মানুষের তৈরি প্রথম ইঞ্জিন হচ্ছে সলিড ফুয়েল ইঞ্জিন। চীনে প্রায় ২০০ বছর আগে এটি প্রথম উদ্ভাবিত হয় এবং তখন থেকেই এটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ১৮০০ সালে লেখা চীনের জাতীয় সঙ্গীতের একটি লাইন হল এ থেকেই বুঝা যায় বহু আগে থেকেই বোমা নিক্ষেপের কাজে রকেট ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

শুষ্ক জ্বালানীচালিত রকেট তৈরির পদ্ধতি বেশ সহজ। আমাদের যা বানাতে হবে তা হচ্ছে এমন একটি যন্ত্র, যা জ্বালানীকে খুব দ্রুত পুড়াবে কিন্তু বিস্ফোরিত হবে না। তুমি নিশ্চয়ই জানো যে গানপাউডার একটি উৎকৃষ্ট বিস্ফোরক।

এতে থাকে ৭৫% নাইট্রেট, ১৫% কার্বন এবং ১০% সালফার। রকেট ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে আমরা চাই জ্বালানীটা বিস্ফোরিত না হয়ে অধিক সফয় ধরে জ্বলে অধিক ঘাত তৈরি করুক। এ জন্যে আমাদেরকে মিক্সচারে কিছুটা পরিবর্তন আনতে হবে। ৭২% নাইট্রেট, ২৪% কার্বন এবং ৪% সালফার ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে মিক্সচারটা গান পাউডার না হয়ে যাবে রকেট ফুয়েল বা রকেটের জ্বালানী। যদি সঠিকভাবে লোড করা যায় তবে এই মিক্সচারটি অনেক দ্রুত জ্বলবে কিন্তু কখনই বিস্ফোরণ ঘটাবে না।

বা দিকে যে রকেটটি দেখতে পাচ্ছ তার বুস্টারটি এখনো জ্বালানো হয় নি। শুষ্ক জ্বালানীকে এখানে সবুজ দেখাচ্ছে। যখন জ্বালানীকে জ্বালানো হবে তখন সেটি টিউবের দেয়ালসহ জ্বলবে। জ্বালানী যদি ফুরিয়ে না যায় তাহলে এ আগুন কেসিং পর্যন্ত চলে যেত। ছোট আকৃতির রকেটের ক্ষেত্রে এই পুড়ানোর প্রক্রিয়াটা ১ সেকেণ্ড কিংবা তারও কম সময় স্থায়ী হয়। একটা বড় আকৃতির স্পেস শাটলের শুষ্ক জ্বালানীর ট্যাঙ্ক, যেটিতে কয়েক মিলিয়ন পাউণ্ড জ্বালানী থাকে সেটিই সর্বোচ্চ ২ মিনিট ধরে জ্বলে পুরো জ্বালানী নিঃশেষ করে দেয়।

শুষ্ক জ্বালানীচালিত রকেটের চ্যানেল কনফিগারেশন:
যখন তুমি শুষ্ক জ্বালানীদ্বারা চালিত আরো উন্নত রকেটের ব্যাপারে জানতে চাইবে, তখন দেখবে প্রতিটি বুস্টারে জ্বালানীর মিশ্রণটি এলুমিনিয়াম পারক্লোরেট(জারক, ৬৯.৬ শতাংশ), এলুমিনিয়াম(জ্বালানী, ১৬ শতাংশ), আয়রন অক্সাইড(অনুঘটক, ০.৪ শতাংশ), একটি পলিমার(যেটি পুরো মিশ্রণকে একসঙ্গে ধরে রাখে, ১২.০৪ শতাংশ) এবং একটি এপক্সি কিউরিং এজেন্ট(১.৯৬ শতাংশ)এর সমন্বয়ে গঠিত। ইঞ্জিনের প্রোপেলারটা দেখতে অনেকটা ১১ পয়েন্ট বিশিষ্ট তারকাচিহ্নের মত।

এই কনফিগারেশনের দরুণ ইগনেশনের সাথে সাথেই ভয়াবহ ধাক্কা পায় রকেটটি। আর উড্ডয়নের ৫০ সেকেন্ডের মধ্যেই এই ধাক্কার পরিমাণ এক তৃতীয়াংশে নেমে আসে। ফলে রকেটটি অতিরিক্তি স্ট্রেসজনিত পরবর্তী ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পায়!

পুড়ানোর মাত্রা বাড়ালে বেশি পরিমাণ ঘাত সৃষ্টি হয় এবং এর ফলে চ্যানেলের তলের আয়তনও বাড়ে। জ্বালানী পুড়ানোর ফলে আকৃতিটা এক সময় বৃত্তের মত হয়ে যায়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সলিড রকেট বুস্টারের ইঞ্জিনকে প্রয়োজন অনুযায়ী অধিক এবং স্বল্প ঘাত সৃষ্টিতে সাহায্য করে।

শুষ্ক জ্বালানী চালিত রকেট ইঞ্জিনের ৩টি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হল-
১) সরল গঠন
২) কম খরচ
৩) নিরাপত্তা

তবে এ ধরণের ইঞ্জিনের দুটি অসুবিধাও আছে-
১) ঘাত নিয়ন্ত্রণ করা যায় না
২) একবার চালু করার পর ইঞ্জিনটিকে আর বন্ধ কিংবা পূনরায় চালু করা যায় না

তার মানে শুষ্ক জ্বালানী চালিত রকেট ইঞ্জিন দিয়ে কেবল ছোটখাট কিছু কাজ করা যায়। এই যেমন মিসাইল নিক্ষেপ। ইঞ্জিনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তরল জ্বালানীর বিকল্প নেই। তাহলে চল আমরা এখন তরল জ্বালানী চালিত রকেটের ব্যাপারে জানতে চেষ্টা করি-

তরল জ্বালানী চালিত রকেট
১৯২৬ সালে রবার্ট গডার্ড প্রথম তরল জ্বালানী চালিত রকেট ইঞ্জিনের পরীক্ষা চালান। তার ইঞ্জিনে গ্যাসোলিন এবং তরল অক্সিজেন ব্যবহার করা হয়েছিল।

রকেট ইঞ্জিনের কিছু প্রধান সমস্যা(যেমন চাপ নিয়ন্ত্রণ, তাপ প্রশমন, গতি নিয়ন্ত্রণ) নিয়ে তিনি কাজ করেন এবং কিছু ক্ষেত্রে সফলতাও পান। এবং এগুলোই ছিল তরল জ্বালানী চালিত রকেট ইঞ্জিনের মূল সমস্যা।

গডার্ডের আইডিয়াটা বেশ সহজ। অধিকাংশ তরল জ্বালানী চালিত রকেট ইঞ্জিনের ক্ষেত্রেই এক ধরণের জ্বালানী এবং একটি জারক(যেমন গ্যাসোলিন এবং তরল অক্সিজেন) একটি দহন চ্যাম্বারে প্রবেশ করানো হয়। ওখানে উত্তপ্ত গ্যাসের উচ্চগতি সম্পন্ন বাষ্প এবং উচ্চ চাপ তৈরি করতে সেগুলোকে পুড়ানো হয়। তারপর গ্যাসটিকে একটি নোজলের মধ্য দিয়ে আসতে হয়, যেটি গ্যাসকে আরও গতিশীল করে দেয়(প্রতি ঘণ্টায় ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার মাইল), তারপর তারা ইঞ্জিন ছেড়ে বেরিয়ে আসে। নিচের ছবিটা দেখ, এটা ধারণাকে আরো পরিষ্কার করে দেবে-

এই ডায়াগ্রামটা আসলে রকেট ইঞ্জিনের জটিলতাকে খুব ভালভাবে প্রকাশ করছে না। তরল জ্বালানী চালিত ইঞ্জিনের অন্যতম প্রধান একটি সমস্যা হল নোজল এবং দহন চ্যাম্বারের তাপকে প্রশমিত করা, কেননা এই কাজে যে তরল ব্যবহার করা হয় সেটি অপেক্ষাকৃত বেশি উত্তপ্ত অংশগুলোতে আগে ছড়িয়ে পড়ে। দহন চ্যাম্বারে জ্বলতে থাকা জ্বালানীকর্তৃক সৃষ্ট উচ্চ চাপকে অগ্রাহ্য করতে হলে পাম্পগুলোকে তারও বেশি চাপ সৃষ্টি করতে হয়। যেকোনো স্পেস শাটলে ব্যবহৃত তরল জ্বালানী চালিত রকেট আসলে দুই ধাপে পাম্পিঙের কাজটা সম্পন্ন করে। একটি হল জ্বালানী পুড়ানো এবং নোজল ও দহন চ্যাম্বারের তাপ প্রশমিত করা।

তরল জ্বালানী চালিত রকেট ইঞ্জিনে যেসকল জ্বালানীর মিশ্রণ ব্যবহার করা হয় সেগুলো হচ্ছে-

তরল হাইড্রোজেন এবং তরল অক্সিজেন ব্যবহৃত হয় স্পেস শাটলের মূল ইঞ্জিনে
গ্যাসোলিন এবং তরল অক্সিজেন ব্যবহৃত হয়েছিল গডার্ডের প্রথম দিককার রকেট ইঞ্জিনে

কেরোসিন এবং তরল অক্সিজেন ব্যবহৃত হয়েছিল এপোলো প্রোগ্রামের স্যাটার্ন ভি রকেটের বুস্টারে

এলকোহল এবং তরল অক্সিজেন ব্যবহৃত হয়েছিল জার্মান ভি টু রকেটে
নাইট্রোজেন টেট্রাক্সাইড/মনোমিথাইল হাইড্রাজিন  ব্যবহৃত হয়েছিল ক্যাসিনি ইঞ্জিনে

এই লেখাটির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আমি চেষ্টা করেছি রকেট ইঞ্জিন চলার পুরো কৌশলটা যতটা সম্ভব সহজভাবে ব্যাখ্যা করতে। কতটা সফল হয়েছি, তা নির্ধারণ করার দায়িত্বটা তোমাদের উপরেই রইল।
তোমাদের মত হীরকখণ্ডগুলোর জ্যোতি ছড়িয়ে পড়ুক মহাশুন্যের গহীন অন্ধকারে, উন্মোচিত হোক মহাবিশ্বের রহস্য, তোমাদের স্বপ্নগুলো খুঁজে পাক ঠিকানা। মহাশুন্যের অসীমতার চেয়েও অসীমগুণ বেশি শুভকামনা রইল তোমাদের জন্যে, ভবিষ্যৎ রকেট বিজ্ঞানীদের জন্যে, ভবিষ্যৎ নভোচারীদের জন্যে, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্যে এবং সর্বোপরি ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্যে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x