পড়াশোনা

ভিটামিন ডি – যে সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা দরকার

1 min read

আমরা আজ অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি। যেসব জৈব খাদ্য উপাদান সাধারণ খাদ্যে অতি অল্প পরিমাণে থেকে দেহের স্বাভাবিক পুষ্টি ও বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে তাকে ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ বলে। কয়েক ধরনের ভিটামিনের মধ্যে আজ আমরা ভিটামিন ডি নিয়ে আলোচনা করব। চলুন তাহলে শুরু করি।

ভিটামিন ডি কী ? What is Vitamin D?

ভিটামিন ডি হলো একটি অতি প্রয়োজনীয় এক ধরনের Vitamin যা দেহের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করে থাকে। এর আরেকটি নাম হলো ক্যালসিফেরল (calciferol)। ভিটামিন ডি এর বেশ কয়েকটি ফর্ম (ভিটার) বিদ্যমান। দুটি প্রধান ফর্ম হল ভিটামিন ডি2 বা আর্গোক্যালসিফেরল, এবং ভিটামিন ডি3 বা কোলেক্যালসিফেরল। আরেকটি মজার তথ্য  হচ্ছে যে এই ভিটামিন টি শুধুমাত্র তেল জাতীয় দ্রাবকে দ্রবীভূত হয় অথাৎ fat soluble। এই Vitamin D টির শোষণ, পরিবহন, এবং জমা থাকে আমাদের শরীরের ফ্যাট বা চর্বিতে। শরীরের ফ্যাটি টিস্যু, কিডনি, লিভার সাধারনত ভিটামিন ডি জমা করে রাখে।

ভিটামিন ডি শরীরে কি কি কাজ করেWhat are the functions performed by Vitamin D?

শুরুতেই বলতে হবে দুটি খনিজ পদার্থের কথা সেদুটি হচ্ছে ফরফরাস এবং ক্যালসিয়াম যা বডির জন্য খুব দরকারী দুটি উপাদান। খবার খাওয়ার পর মানুষের অন্ত্র তথা পরিপাক তন্ত্র হতে এই দুই খনিজের শোষন করার কাজ টা তরান্বিত করে আমাদের আলোচ্য ভিটামিনটি। বলুন তো সেটি কি?

ঠিক ধরেছেন সেটি হলো ভিটামিন ডি। শুধু শোষন নয়, এই দুটি খনিজ (ফরফরাস এবং ক্যালসিয়াম ) যেন শরীরে ভালো ভাবে কাজ করতে পারে সেই ব্যবস্থাটাও করে আমদের Vitamin D. এবার আসা যাক আমাদের দাত এবং হাড়ের ব্যাপারে। জি পাঠক ঠিক ধরেছেন দাত এবং হাড়ের কারনে আমরা ইচ্ছা মত খেতে পারি এবং চলা ফেরা করতে পারি। এই দাত এবং হাড় হাড্ডি যেন সঠিক ভাবে গঠিত হয় সেই কাজটিও ভিটামিন ডি করে থাকে। তাহলে বুঝুন এই ভিটামিন ডি আমাদের কি পরিমান উপকার সাধন করে চলেছে সেই জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি।

এমনকি এই ভিটামিন ডি স্তন ক্যান্সার, ফুসফুস ক্যান্সার, প্রস্টেট ক্যান্সার, অগ্ন্যাশয় ক্যান্সার প্রতিরোধ; টিউমার গঠনকে মন্থরকরন, প্রদাহ কমানো এবং দুশ্চিন্তাকে ও অবসাদ কম হতে হতে সাহায্য করে। তাছাড়াও ভিটামিন ডি হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং ডায়াবেটিস এর ঝুকি কমায়।

শরীরে ভিটামিন ডি অভাব কেন হয়Reasons for Vitamin D deficiency in body

উওর একেবারেই সিম্পল। এই ধরুন আমি ঠিক মত ভিটামিন ডি যুক্ত খবার খেলাম না, কিংবা আমি আমি এমন খাবার খেলাম যাতে ভিটামিন ডি কম পরিমানে আছে । অথবা আমি ভিটামিন যুক্ত খাবার খেলাম ঠিকই কিন্তু সেটা আমার পরিপাক তন্ত্র হতে শরীরের ভেতরে (রক্তে) শোষন হলো না। তাহলে আমার শরীরে Vitamin D এর অভাব  হবে।

আরেকটি কারণ না বললেই নয়, যা আপনাদের সবার জানা সেটা হলো সূর্যালোকের সংস্পর্শে কম আসা। যেহেতু সূর্যালোক এর উপস্থিতে শরীর ভিটামিন ডি তৈরি করে থাকে সেহেতু কেউ যদি  নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে কম সময় শরীরে সূর্যালোক লাগায় তবে তার শরীরে ভিটামিন ডি এর অভাব হতে পারে।

ভিটামিন ডি যুক্ত কিছু খাবার Name of some Vitamin D enriched foods

আসুন জেনে নেওয়া যাক এমন কিছু খাবারের নাম যেগুলো খেলে আমাদের শরীরে ভিটামিন ডি এর চাহিদা পূরণ হবে

  • দুধ
  • ডিম
  • মাংস, কলিজা
  • সামুদ্রিক মাছ যেমন স্যামন ,সাডিন,টুনা
  • তৈলাক্ত মাছ
  • পনির,দই
  • বিভিন্ন রকমের ডাল, মটরশুটি, সীমের বিচি
  • ভোজ্য তেল
  • মাশরুম
  • ফরটিফায়েড খাবারঃ কিছু খাবারে ফরটিফায়েড করে ভিটামিন ‘ডি’ বাড়ানো যায়। এসব খাবার বিশ্বের অন্যান্য দেশে বেশি দেখা যায় আমাদের দেশের তুলনায়। যেমন—কিছু সিরিয়ালস, ওটস, ফরটিফায়েড কমলার জুস।

শরীরে ভিটামিন ডি এর ঘাটতি জনিত ঝুকি Health Risks of Vitamin D deficiency

  • ভিটামিন ডি এর অভাবে শিশুদের রিকেট রোগ হয়। শিশুদের পা ধনুকের মতো বেঁকে যায় এবং মাথার খুলি বড় হয়ে পড়ে।
  • হাড়ের ক্ষয় রোগঃ অস্টিওপোরেসিস
  • বড়দের অস্টিওম্যালেসিয়া নামে একপ্রকার রোগ হয়। এই রোগে বয়স্কদের হাড় থেকে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস ক্ষয় হয়ে পড়ে। কখনো কখনো কোমরে ও মেরুদণ্ডে বাতের ব্যথার মতো ব্যথা অনুভূত হয়। অনেক ক্ষেত্রে মেরুদণ্ড বেঁকে যায়।
  • ভিটামিন ডি এর অভাবে আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমত হ্রাস পেতে পারে যার ফলে বিভিন্ন ভাইরাস , ব্যাক্টেরিয়ার দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঝুকি বেড়ে যায়।
  • ভিটামিন ডি এর ঘাটতি বেশ কিছু রোগ যেমন সিজোফ্রেনিয়া, ডিপ্রেশন, ডায়াবেটিস, হার্টের অসুখ ইত্যাদির ঝুকি বাড়িয়ে আপনার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটাতে পারে ।

কিভাবে বুঝবেন যে আপনার শরীরে ভিটামিন ডি এর অভাব আছে? How do you understand that you are suffering from Vitamin D deficiency?

চিকিৎসকগণ রক্ত পরীক্ষা করে রোগীর শরীরের ভিটামিন ডি এর পরিমান নিরুপন করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন যে রোগীর ভিটামিন ডি এর আটতি আছে নাকি নেই।

তবে কোন ভিটামিন ডি এর ঘাটতিতে ভোগা ব্যক্তি নিচের উপসর্গে ভুগতে পারেন, যেমন

  • হাড় এবং মেরুদন্ড ব্যথা
  • হাড় ক্ষয়
  • ঘা শুকাতে অনেক দেরী হওয়া
  • চুল পড়ে যাওয়া
  • পেশীতে ব্যাথা
  • অবসাদ এবং দুশ্চিন্তা

শরীরে ভিটামিন ‘ডি’ এর ঘাটতি হলে কি করবেন What to do for eliminating Vitamin D deficiency?

প্রথমেই আপনাকে ভিটামিন ডি যুক্ত খবার পর্যাপ্ত পরিমানে খেতে হবে। সূর্যের আলোতে গিয়ে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি করার সুযোগ দিতে হবে। এগুলা নিয়মিত করার কর পরও যদি সমস্যা সমাধান না হয় তবে আপনাকে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। উনি আপনাকে চিকিৎসা দিবেন। তার মধ্যে যেটা অবশ্যাই দিবেন সেটা হলো ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট ।

বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস গুলো ভালো মানের ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট তৈরি করে। এটি অন্যান্য ভিটামিন কিংবা খনিজের সাথে কম্বিনেশন আকারে পাওয়া যায় যেমন ক্যালসিয়াম+ ভিটামিন ডি প্রভৃতি।

অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা

আপনি যদি মনে করেন যে, আপনার ভিটামিন ডি এর ঘাটতি আছে তবে আপনি এলাকার ফার্মেসি থেকে ক্যালসিয়াম ভিটামিন ডি কিনে খাবেন না। অন্তত সরকারি হাসপাতালে যান, মাত্র ১০ টাকা দিয়ে টিকেট কেটে একজন এমবিবিএস ডাক্তার দেখান। ডাক্তার মনে করলে আপনাকে ঔষধ লিখে দেবেন এবং হাসপাতাল থেকে আপনি ক্যালসিয়াম ভিটামিন ডি এর এক কৌটা ওষুধ বিন্যামূল্যে পাবেন, টাকা খরচ করে কিনতে হবে না।

গর্ভবতী মায়েদের জন্য

বাচ্চা নেওয়ার আগে  থেকেই মহিলাদের ফলিক এসিড বড়ি খেতে হয় যা বাচ্চা হওয়া পর্যন্ত খাওয়া চালিয়ে যেতে হবে। আর বাচ্চা গর্ভে আসার তিন আস পর থেকে ফলিক এসিডের সাথে ক্যালসিয়াম ভিটামিন ডি বড়ি এবং আয়রন বড়ি খেতে হবে বাচ্চা হওয়া পর্যন্ত। সরকারী হাসপাতাল, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিকে এই ওষুধ গুলো ফ্রি দেওয়া হয় ।

জরুরি সতর্কতাঃ

শরীরের জন্য অপ্রয়োজনীয় এবং অধিক পরিমানে ভিটামিন ডি আপনার শরীরে বিভিন্ন রকমের সমস্যা  (hypercalcemia, hypercalciuria,  cardiac arrhythmias,  kidney stones ইত্যাদি) তৈরি করতে পারে, যা কিনা মৃত্যুর কারন হতে পারে। তাই ডাক্তারের/স্বাস্থ্য কর্মীর পরামর্শ ব্যাতিত ক্যালসিয়াম Vitamin D খাবেন না।

আরেকটু তথ্য

গড়পড়তা একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের দৈনিক ১ হাজার মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম ও ৬০০ ইউনিট ভিটামিন ডি লাগে। নারীদের এবং সত্তরোর্ধ্ব পুরুষদের দরকার হয় একটু বেশি ক্যালসিয়াম, ১ হাজার ২০০ মিলিগ্রাম। গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েরও লাগে একটু বেশি।

এই আর্টিকেলটি তৈরি করতে নিমোক্ত উৎসের সাহায্য নেওয়া হয়েছে, তাই কৃতজ্ঞচিত্তে ঋণ স্বীকার করিলাম ।

  • Chapter 5: Nutrition and your health, Glencoe Health, Texas Edition
  • দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক কালের কন্ঠ
  • উইকিপিডিয়া

বিঃদ্রঃ রেফারেন্স লেখার জন্য স্বীকৃত পদ্ধতি  ব্যবহার করা হয় নাই।

Rate this post
Mithu Khan

I am a blogger and educator with a passion for sharing knowledge and insights with others. I am currently studying for my honors degree in mathematics at Govt. Edward College, Pabna.

Leave a Comment