মুমিনদের জুমার দিনের আমলে

28

জুমার দিন সপ্তাহের সেরা দিন। মুসলমানদের একসঙ্গে মিলনের দিন। পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহমর্মিতা প্রদর্শনের দিন। ইসলামের দৃষ্টিতে পবিত্র জুমা ও জুমাবারের রাত-দিন অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ। জুমার দিনকে সাপ্তাহিক ঈদের দিন বলা হয়েছে। জুমার গুরুত্ব আল্লাহ তায়ালার কাছে এত বেশি যে, কোরআনে ‘জুমা’ নামে একটি স্বতন্ত্র সূরা নাজিল করা হয়েছে।

জুমার দিন সুরা কাহফ তেলাওয়াত, মনোযোগসহ ইমামের খোতবা শোনা, দরূদ পাঠ করা এবং আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত আল্লাহর জিকির ও ইবাদতে অতিবাহিত করার নির্দেশ দিয়েছেন স্বয়ং বিশ্বনবি।

সুরা কাহফ তেলাওয়াতের আমল

জুমার দিনের বিশেষ আমলসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করা। তা হোক জুমার আগে অথবা পরে। যারা এ দিনের সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করবে কেয়ামতের দিন তা পাঠকারীর জন্য আসমানসহ নূরে পরিণত হবে। হাদিসে এসেছে-

* হজরত আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহফ পাঠ করবে তার জন্য এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত নূর হবে।

* হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহফ তেলাওয়াত করবে, সে আট দিন পর্যন্ত সব ধরণের ফেতনা থেকে মুক্ত থাকবে। যদি দাজ্জালও বের হয় তবে সে দাজ্জালের ফেতনা থেকেও মুক্ত থাকবে।

* অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত তার সব গোনাহ মাফ হয়ে যাবে। তবে উল্লিখিত গোনাহ মাফ হওয়ার দ্বারা ছোট গোনাহ উদ্দেশ্য। কারণ ওলামায়ে কেরামের ঐকমত্য যে, কবিরা গোনাহ তওবাহ করা ছাড়া মাফ হয় না।’

বেশি বেশি দরূদ পড়ার আমল

হজরত আওস ইবনে আওস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের সবদিন অপেক্ষা জুমার দিনটিই হলো শ্রেষ্ঠ। এ দিনে হজরত আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ দিনেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এ দিনেই বিশ্ব ধ্বংসের জন্য শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে এবং এ দিনের পুনর্জীবিত করার জন্য দ্বিতীয়বার ফুঁক দেয়া হবে। আর এ দিন তোমরা আমার প্রতি বেশি বেশি দরূদ পাঠ কর।

তোমাদের দরূদ নিশ্চয় আমার কাছে উপস্থিত করা হবে। সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের দরূদ আপনার কাছে কেমন করে উপস্থিত করা হবে অথচ আপনি তখন মাটি হয়ে যাবেন?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেন, ‌আল্লাহ তাআলা নবিদের শরীর জমিনের জন্য হারাম করে দিয়েছেন।’ (আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, বায়হাকি)

আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত দোয়া করার আমল

জুমার দিন দোয়া কবুলের জন্য একটি সময় আছে, যখন বান্দার কোনো দোয়া ফেরত দেয়া হয় না। যাদুল মাআদ গ্রন্থে এসেছে, ‘এ মর্যাদাবান মুহূর্তটি হলো- জুমার দিন আছরের নামাজ আদায়ের পর (মাগরিব পর্যন্ত)।’

এ মতে পক্ষে একটি দীর্ঘ হাদিস রয়েছে। জুমার দিন সূর্য উদয় হওয়ার পর (দুনিয়ায়) মানুষ এবং জিন ব্যতিত প্রত্যেক প্রাণীই কেয়ামতের ভয়ে আতংকিত থাকে। জুমার দিনে এমন একটি বরকতময় সময় আছে, যাতে মুসলিম বান্দা নামাজরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে যা প্রার্থনা করবে, আল্লাহ তাকে তা দান করবেন-

কা’ব বিন মালিক এ হাদিসের বর্ণনাকারী হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞেস করলেন, এটি কি প্রত্যেক বছরে হয়ে থাকে?

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, বরং তা (এ সময়টি) প্রত্যেক জুমাতেই রয়েছে। অতঃপর কা’ব বিন মালিক তাওরাত (কিতাব) খুলে পাঠ করলেন এবং বললেন, আল্লাহর রাসুল সত্য বলেছেন।

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, অতঃপর আমি (তাওরাত কিতাবের পারদর্শী) হজরত আব্দুল্লাহ বিন সালামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। এবং তাঁকে কা’ব বিন মালিকের সঙ্গে আমার বৈঠকের কথা জানাই। তখন তিনি (হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম) বললেন, আমি সেই সময়টি সম্পর্কেও অবগত আছি।

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু তার কাছ থেকে সেই সময়টি সম্পর্কে জানতে চান। তিনি বলেন-‘এটি (দোয়া কবুলের সেই সময়টি) হচ্ছে জুমার দিনের শেষ মুহূর্ত।’

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, এটি কি করে সম্ভব? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো বলেছেন, ‘মুসলিম বান্দা তখন নামাজরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে যা চাইবে আল্লাহ তাকে তা-ই দান করবেন।’

আর (জুমার) দিনের শেষ মুহূর্তের সময়টিতে নামাজ পড়া বৈধ নয় (আসর নামাযের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নামায পড়া নিষিদ্ধ)। সুতরাং উহা তো নামাজের সময় নয়।

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম তখন বললেন-

‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেন নি যে ব্যক্তি কোনো মজলিসে বসে নামাজের অপেক্ষায় থাকে সে ব্যক্তি নামাজ পড়া (নামাজের ওয়াক্ত হওয়া) পর্যন্ত নামাজেই মশগুল থাকে?

সর্বোপরি মুসলিম উম্মাহর জন্য জুমার দিন যেহেতু ইবাদত-বন্দেগির দিন হিসেবে সাব্যস্ত; তাই জুমার দিন আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে অতিবাহিত করাই হবে সব মুসলমানের একান্ত কাজ। আর উল্লেখিত বিশেষ আমলগুলো জুমার দিনের জন্য সুনির্ধারিত।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে জুমার দিনে সুরা কাহফ পড়ার, ইমামের খোতবা শোনার এবং আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়ে বেশি বেশি দরূদ ও ইবাদতে আত্মনিয়োগ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Previous articleচলন্ত বাসে ডাকাতি-ধর্ষণ: আরও ২ জন গ্রেফতার
Next articleশুধু খেলাধুলা নয়, শেখ কামালের কারণে বাংলাদেশের সংগীতও আধুনিক রূপ লাভ করেছে: প্রধানমন্ত্রী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here