আমলাতন্ত্র কি? (What is Bureaucracy in Bengali/Bangla?)
আমলাতন্ত্র এমন এক শাসনব্যবস্থা যাতে স্থায়ী সরকারি কর্মকর্তারা দায়িত্ব বিভাজনের মাধ্যমে সরকারের সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। সুনির্দিষ্ট বিধি, রীতি-নীতি নিয়ম ও লিখিত আইন অনুসারে আমলাতন্ত্র পরিচালিত হয়।

ওয়েবারের মতে, আমলাতন্ত্র হলো একটি বিশেষ উপায় বা পদ্ধতির সমষ্টি, যার মাধ্যমে শিল্প সমাজের সদস্যগণ তাদের উদ্দেশ্যগুলি যুক্তিসম্মত উপায়ে অর্জন করতে পারেন।
ওয়েবার আমলাতন্ত্রের আলোচনায় ‘আদর্শরূপ’ নামক বিশেষ পদ্ধতিটির প্রয়োগপূর্বক বিশুদ্ধ আমলাতন্ত্রের একটি তাত্ত্বিক প্রকরণ গড়ে তুলেছেন। আধুনিক ধনতান্ত্রিক, শিল্পসমাজে আদর্শরূপ আমলাতন্ত্র দেখা যায়।

আমলাতন্ত্রের ব্যুৎপত্তি
আমলাতন্ত্রের ইংরেজি প্রতিশব্দ বুরোক্রেসি।, বুরোক্রেসির মূল উৎপত্তি ফরাসী শব্দ থেকে। ফরাসী বুরো (bureau’) শব্দের অর্থ ডেস্ক বা অফিস। আর গ্রিক শব্দ κράτος ক্র্যাটোস – শাসন বা রাজনৈতিক শক্তি। ১৭শ শতাব্দীর মধ্যবর্ত্তী সময়ে ফরাসী অর্থনীতিবিদ জ্যাকুইস ক্ল্যদে ম্যারি ভিনসেন্ট দ্য গোউর্ন্যে প্রথম এই শব্দের প্রচলন করেন। তিনি স্যাটায়ার শব্দ হিসেবে এই শব্দের প্রচলন শুরু করেন। যদিও তিনি কখনই এই শব্দ লিখেননি, কিন্তু তার লেখা এক চিঠিতে এই শব্দের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

১৮১৮ সালে প্রথম ইংরেজি ভাষাতে বুরোক্রেসি শব্দের ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।
ম্যাক্স ওয়েবার-কে আমলাতন্ত্রের জনক বলা হয়।

আমলাতন্ত্রের চারটি পরিকাঠামো বা সাংগঠনিক দিক
ওয়েবার আমলাতন্ত্রের চারটি পরিকাঠামো বা সাংগঠনিক দিক রয়েছে।
১) প্রশাসনিক স্তরে প্রতিটি কার্যালয়ে কর্মচারীদের মধ্যে সুস্পষ্ট শ্রমবিভাজন লক্ষ্য করা যায়।
২) কর্মচারী বৃন্দকে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির মাধ্যমে নিয়োগ করা হয় এবং তাদের পদোন্নতির জন্য কর্মদক্ষতা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেয়া হয়।
৩) কর্তৃত্ব, ক্ষমতা ও পদমর্যাদা অনুসারে কর্মচারীবৃন্দ ক্রমোচ্চ স্তরে বিন্যাপ্ত থাকেন।
৪) সম্পূর্ণ প্রশাসনিক সংগঠনটির কর্মচারীবৃন্দ একে অপরের সঙ্গে সংযোগিতা ও তথ্য সম্প্রচারণের মাধ্যমে কর্মসম্পাদন করেন।

আমলাতন্ত্রে সাতটি মূলনীতি

ম্যাক্স ওয়েবার আমলাতন্ত্রের সাতটি মূল নীতি উল্লেখ করেছেন। এগুলি হলো–
১) চাকরি ক্ষেত্রে প্রতিটি কর্মচারীর দায়িত্ব, অধিকার, কর্তব্য এবং কর্তৃত্বের পরিধি সুনির্দিষ্ট থাকে।
২) তদারক ও বশ্যতার পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
৩) কর্তৃত্বের সামঞ্জস্যপূর্ণ নির্দেশ।
৪) লিখিত নথিপত্রের সাহায্যে কার্য সম্পাদন করা হয়।
৫) চাকরিতে নিয়োগ ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
৬) সুনির্দিষ্ট নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্য পরিচালনা করা হয়।
৭) চাকরিতে শ্রমিক বা কর্মচারীদের নিযুক্তি করা ও কার্য নির্দিষ্ট করা হয় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।

আমলাতান্ত্রের বৈশিষ্ট্য (Characteristics of Bureaucracy)
ওয়েবার আমলাতন্ত্রের কতগুলি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। এই বৈশিষ্ট্যগুলি হলো –
১) আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিটি আধিকারিকদের কার্যের সীমারেখা নির্দিষ্ট আইন ও নিয়ম অনুসারে নির্ধারিত থাকে। এই নির্ধারিত কাজে অতিরিক্ত বা স্বল্প কাজকর্ম আইন অনুসারে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। সুতরাং নিয়ম অনুসারে আমলাতান্ত্রিক আধিকারিদের নিজের এক্তিয়ারভুক্ত কার্যাবলী সম্পাদন করা গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য বলে বিবেচিত হয়।

২) আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিটি কার্যালয়ে কর্তৃত্ব ক্রমোচ্চস্তরে বিন্যস্ত থাকে। অর্থাৎ প্রতিটি আধিকারিকদের কার্যবিধি উচ্চতর স্তরের আধিকারিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়।

৩) প্রতিটি দফতরের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত ও প্রতিষ্ঠিত হয় লিখিত নথিপত্রের যা ফাইলের মাধ্যমে এবং সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ব্যবস্থা পরিচালিত হয় সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির দ্বারা। এমনকি আমলাতান্ত্রিক আইন, নীতি ও কার্যপরিধি সমূহ লিখিত আকারে নথিভুক্ত রাখা হয়। এই সকল প্রশাসনিক ব্যবস্থা অথবা আমলাতান্ত্রিক সংগঠন পরিচালনার জন্য প্রত্যেক আধিকারিক বা কর্মচারীগণ নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত থাকে।

৪) প্রতিটি কর্মচারী বা আধিকারীকদের চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোন প্রকার ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা আবেগকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না। এ প্রসঙ্গে ওয়েবার বলেছেন, “bureaucrats may functions as emotionally detached or professional experts.” বরং প্রযুক্তিগত বা শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনা করেই কর্মচারী বা আধিকারিকদের নিয়োগ করা হয়।

৫) যে সকল কর্মচারী ও আধিকারীকরা স্থায়ীপদে আসীন হয়েছেন, তারা অবশ্যই কঠোর নিয়ামানুবর্তিতা বা শৃঙ্খলা অনুসরণ করতে বাধ্য থাকেন।

৬) যে সকল ব্যক্তি আমলাতান্ত্রিক সংগঠনে কর্মচারী বা আমলা হিসাবে নিযুক্ত রয়েছেন, তারা অবশ্যই ব্যক্তিগত বিষয়াদি এবং কর্মক্ষেত্রের বিষয়াদির মধ্যে প্রভেদ বা পার্থক্য সম্পর্কে সচেতন থাকেন। এক্ষেত্রে কখনই ব্যক্তিগত সমস্যা বা কাজকর্মের জন্য দফতরের দায়িত্ব থেকে কোন আমলা বা কর্মচারী বিরত থাকতে পারে না। আবার একইভাবে দফতরের ক্ষমতাকে কোন আমলা বা কর্মচারী ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারেন না।

৭) আমলাতান্ত্রিক সংগঠনের নিয়ম অনুসারে প্রতিটি আমলা, আধিকারিক ও কর্মচারীবৃন্দের চাকরি ক্ষেত্রে পদোন্নতি বিষয়টি বিবেচিত হয় জ্যেষ্ঠত্ব (seniority), অভিজ্ঞতা (experience) এবং গুণাগুত যোগ্যতার (merit) ভিত্তিতে। এ বিষয়ে ওয়েবার বলেছেন, “Bureaucratic administration means fundamentally the exercise of control on the basis of knowledge. This is the feature of it which makes it specifically ratonal.”

৮) পদমর্যাদা অনুসারে প্রতিটি আধিকারিক ও কর্মচারীদের বেতন নিদিষ্ট করা হয়। সাধারত তাদের নির্দিষ্ট হারে অবসরকালীন ভাতা প্রদান করা হয়।

৯) প্রথাগত নিয়ম অনুসারে আমলাতান্ত্রিক সংগঠনে প্রতিটি কর্মচারী ও আধিকারিকগণ নির্দিষ্ট পথে সংযোগ সম্পর্ক রক্ষা করে থাকে। সঠিক মাধ্যমে (proper channels) আধিকারিক ও কর্মচারীবৃন্দকে উচ্চ পদস্থ আমলাগণ নির্দেশাবলী সম্প্রচার করে থাকে।

১০) সাধারণভাবে আমলাতন্ত্র হলো একটি কার্যালয় বা দফতরের সাংগঠনিক রূপ যেখানে ব্যবসা সংক্রান্ত প্রতিটি কার্যধারা ফাইলের আকারে সংরক্ষণ করা হয়।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x