পড়াশোনা
1 min read

নিষ্ক্রিয় গ্যাস কাকে বলে? নিষ্ক্রিয় গ্যাস কয়টি ও কি কি? – Noble Gas in Bangla

Updated On :

নিষ্ক্রিয় গ্যাস কি বা কাকে বলে? (What is a Noble Gas in Bengali/Bangla?)

যে সব গ্যাসীয় মৌল রাসায়নিকভাবে নিস্ক্রিয় অর্থাৎ অন্য কোনো মৌলের সাথে সংযুক্ত হয় না, এমনকি নিজেদের মধ্যেও সংযুক্ত হয় না, সর্বদা এক পরমাণুক অবস্থা বিরাজ করে তাদেরকে নিস্ক্রিয় গ্যাস (Noble Gas) বলে। নিস্ক্রিয় গ্যাস মোট ৭টি। এগুলো হলো : হিলিয়াম (He), নিয়ন (Ne), আর্গন (Ar), ক্রিপ্টন (Kr), জেনন (Xe), রেডন (Rn) এবং ওগানেসন (Og)। সাধারণ অবস্থায় এগুলো বর্ণহীন, গন্ধহীন এবং এক পরমাণুক গ্যাস। এছাড়াও এগুলোর স্ফুটনাংক ও গলনাংক খুবই কম। আলোকসজ্জা, ওয়েল্ডিং এবং মহাশূন্য প্রযুক্তিতে এই গ্যাসগুলোর অনেক ব্যবহার রয়েছে।

নিস্ক্রিয় গ্যাসগুলোর ভৌত ধর্ম (Physical properties of Noble gases?)

  • নিস্ক্রিয় গ্যাসগুলো সাধারণ তাপমাত্রা ও চাপে এক পরমাণুক গ্যাস।
  • নিস্ক্রিয় গ্যাসগুলোর কোন বর্ণ, স্বাদ বা গন্ধ নেই।
  • প্রতি লিটার পানিতে নিস্ক্রিয় গ্যাসের দ্রাব্যতা অনেক কম।
  • এসব গ্যাসের গলনাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্ক অত্যন্ত কম। যেমন He, এর স্ফুটনাংক -269°C থেকে Rn-এ সর্বোচ্চ -65°C।
  • নিস্ক্রিয় গ্যাসসমূহের মধ্যে দুর্বল আকর্ষণ বল থাকার কারণে এদের গলনতাপ ও বাষ্পীয়ভবন তাপ কম।
  • নিস্ক্রিয় গ্যাসের আয়নিকরণ শক্তি সবচেয়ে বেশি।
  • পারমাণবিক সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে নিস্ক্রিয় গ্যাসসমূহের আয়নিকরণ শক্তি কম হয়।
  • আকর্ষণ বল কম থাকার কারণে নিস্ক্রিয় গ্যাসগুলোকে তরলে পরিণত করা অনেক কঠিন।

 

নিস্ক্রিয় গ্যাসগুলোর রাসায়নিক ধর্ম (Chemical properties of Noble gases?)

রাসায়নিকভাবে নিস্ক্রিয় হলেও নিস্ক্রিয় গ্যাসসমূহ দুর্বল আকর্ষণ বল এর সাহায্যে বেশ কিছু যৌগ গঠন করে। যেমন– সমযোজী যৌগ, সন্নিবেশ যৌগ, হাইড্রেট যৌগ এবং ক্ল্যাথরেট যৌগ।

 

নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলি নিষ্ক্রিয় কেন?

নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলির ইলেকট্রন বিন্যাস করলে দেখা যায় হিলিয়াম ব্যতীত অন্য নিষ্ক্রিয় গ্যাস গুলোর সর্ববহিঃস্থ শক্তিস্তরে অষ্টক পূর্ণ থাকে। নিষ্ক্রিয় মৌল সমূহের সর্বশেষ শক্তিস্তরে অষ্টক পুর্ণ থাকায় নিষ্ক্রিয় মৌল সমূহ যথেষ্ট স্থিতিশীল থাকে। ফলে এসব মৌল সমূহ সহজে কোন বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে না। সর্ববহিঃস্থ স্তরে ইলেকট্রন দ্বারা অষ্টক পূর্ণ থাকে যা অত্যন্ত সুস্থিত। এ সুস্থিত ইলেকট্রন বিন্যাস ভাঙ্গতে অনেক শক্তির প্রয়োজন হয়। তাই স্বাভাবিক অবস্থায় নিষ্ক্রিয় মৌল সমূহ অন্য কোন মৌলের সাথে যুক্ত হয় না।

অর্থাৎ বহিঃস্থ স্তরে সুবিন্যাস্ত ইলেকট্রন বিন্যাসের কারণে নিষ্ক্রিয় মৌল সমূহ নিষ্ক্রিয় হয়।

এদের ইলেকট্রন বিন্যাস নিম্নরূপঃ

He (2) : 1s²

Ne (10) : 1s² 2s² 2p⁶

Ar (18) : 1s² 2s² 2p⁶ 3s² 3p⁶

Kr (36) : 1s² 2s² 2p⁶ 3s² 3p⁶ 3d¹º 4s² 4p⁶

Xe (54) : 1s² 2s² 2p⁶ 3s² 3p⁶ 3d¹º 4s² 4p⁶ 4d¹º 5s² 5p⁶

Rn (86) : 1s² 2s² 2p⁶ 3s² 3p⁶ 3d¹º 4s² 4p⁶ 4d¹º 5s² 5p⁶ 4f¹⁴ 5d¹º 6s² 6p⁶

 

নিষ্ক্রিয় গ্যাসের ব্যবহার (Use of Noble gas?)

হিলিয়াম গ্যাসের ব্যবহারঃ

১. হিলিয়াম গ্যাস হালকা ও অদাহ্য হওয়ায় বেলুন ও উড়োজাহাজের টায়ার স্ফীত  করার কাজে ব্যবহার করা হয়।

২. ডুবুরিরা শ্বাসকার্যে ব্যবহারের জন্য 20% অক্সিজেন ও 80% হিলিয়াম গ্যাসের মিশ্রণ ব্যবহার করেন।

৩. হিলিয়াম ও অক্সিজেন গ্যাসের মিশ্রণ হাঁপানি রোগের চিকিৎসা ব্যবহার করা হয়।

৪. নিষ্ক্রিয় পরিবেশ সৃষ্টি করতে হিলিয়াম গ্যাস ব্যবহার করা হয়।

৫. কম তাপমাত্রায় গবেষণার জন্য গবেষণাগারে হিলিয়াম গ্যাস ব্যবহার করা হয়।

৬. প্রতিপ্রভ নলে নিয়ন গ্যাসের সাথে হিলিয়াম গ্যাস ব্যবহার করা হয়।

৭. নিম্ন তাপমাত্রা পরিমাপে ব্যবহৃত গ্যাস থার্মোমিটারে হিলিয়াম ব্যবহার করা হয়।

৮. এটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারের ব্যবহার করা হয়।

 

নিয়ন গ্যাসের ব্যবহারঃ

১. নিয়ন বাতি ও নিয়ন চিহ্ন প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা হয়।

২. আলোকসজ্জার জন্য নিয়ন গ্যাস ইলেকট্রিক বাল্বে ব্যবহৃত হয়।

৩. সবুজ ঘরে উদ্ভিদ ও ফুলের বৃদ্ধিতে সহায়ক হিসেবে নিয়ন গ্যাস ব্যবহার করা হয়।

৪. টেলিভিশন সেট, বেতার চিত্র এবং শব্দ চলচ্চিত্র ইত্যাদি’তে নিয়ন ব্যবহার করা হয়।

৫. বৈদ্যুতিক যন্ত্রের রক্ষাকবচ হিসেবে নিয়ন ও হিলিয়াম এর মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়।

৬. বিমানের পাইলটেরা আলোক সংকেতরূপে নিয়ন আলো ব্যবহার করে। কারণ এটি ঘন কুয়াশার মধ্যেও দৃশ্যমান হয়।

৭. নিয়ন আলো উজ্জ্বল লাল হয়ে থাকে। কিন্তু সবুজ বা নীল বর্ণের আলো তৈরিতে অন্যান্য নিষ্ক্রিয় গ্যাস বা মার্কারির সাথে নিয়ন গ্যাসের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়।

৮. ভোল্টমিটার, রেকটিফায়ার প্রভৃতি যন্ত্র সংরক্ষণে হিলিয়াম-নিয়ন গ্যাসের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়।

 

আর্গন গ্যাসের ব্যবহারঃ

১. সস্তা বৈদ্যুতিক বাল্বের ভিতর নিষ্ক্রিয় পরিবেশ সৃষ্টিতে ব্যবহার করা হয়।

২. রাসায়নিক বিক্রিয়ায় নিষ্ক্রিয় পরিবেশ সৃষ্টিতে আর্গন গ্যাস ব্যবহার করা হয়।

৩. ঝালাইকাজে নিষ্ক্রিয় পরিবেশ সৃষ্টিতে আর্গন গ্যাস ব্যবহার করা হয়।

৪. তেজস্ক্রিয়তা মাপার যন্ত্র, যেমন- গাইগার মুলার কাউন্টারে আর্গন গ্যাস ব্যবহার হয়।

৫. গ্যাস ক্রোমাটোগ্রাফিতে আর্গন ব্যবহার করা হয়।

 

ক্রিপটন গ্যাসের ব্যবহারঃ

১. কসমিক রশ্মি পরিমাপে আয়নিকরণ প্রকোষ্ঠে ক্রিপটন ব্যবহার করা হয়।

২. বৈদ্যুতিক গ্যাস বাল্বে বা টিউবলাইটে এটি ব্যবহার করা হয়।

৩. তীব্র আলো সৃষ্টির জন্য ফটোগ্রাফিক ফ্ল্যাশ বাল্বে  ক্রিপটন ব্যবহার করা হয়।

৪. বিভিন্ন তেজস্ক্রিয়তা পরিমাপক যন্ত্রে ক্রিপটন ব্যবহার  করা হয়।

৫. খনি শ্রমিকদের ক্যাপ ল্যাম্পে ক্রিপটন ব্যবহার করা হয়।

 

জেনন গ্যাসের ব্যবহারঃ

১. গামা রশ্মি, নিউটন ও অন্যান্য নিউক্লিয় কণা শনাক্তকরণের জন্য বুদবুদ প্রকোষ্ঠে জেনন গ্যাস ব্যবহার করা হয়।

২. দ্রুতগতিসম্পন্ন আলোকচিত্র গ্রহণ করার জন্য ক্রিপটন-জেনন গ্যাসের মিশ্রণ ফটোগ্রাফিক ফ্লাশ নলে ব্যবহার করা হয়।

 

রেডন গ্যাসের ব্যবহারঃ

১. ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করার কাজে রেডন ব্যবহার করা হয়।

২. তেজস্ক্রিয় গবেষণার কাজে এটি ব্যবহার করা হয়।

৩. শরীরের ক্ষতিকর বৃদ্ধি লাঘবে রেডিওথেরাপি চিকিৎসায় রেডন ব্যবহার করা হয়।

 

নিষ্ক্রিয় গ্যাস সম্পর্কিত প্রশ্ন ও উত্তর

নিস্ক্রিয় গ্যাসসমূহ এক পরমাণুক কেন?

উত্তরঃ নিস্ক্রিয় গ্যাসসমূহ অত্যন্ত স্থিতিশীল। এ গ্যাসসমূহের যে কোন পরমাণুর সর্বশেষ শক্তিস্তর ইলেকট্রন দ্বারা পূর্ণ থাকে। এর অন্য কোন মৌলের সাথে ইলেকট্রন আদান-প্রদান বা শেয়ার করে না এমনকি নিজেদের মধ্যেও নয়। ফলে কোন প্রকার বন্ধন গঠিত হয় না বলেই নিস্ক্রিয় গ্যাসসমূহ এক পরমাণুক।

 

নিষ্ক্রিয় গ্যাসকে অভিজাত গ্যাস বলা হয় কেন?

উত্তরঃ পর্যায় সারণীর গ্রুপ-১৮ তে অবস্থিত হিলিয়াম, নিয়ন, আর্গন, ক্রিপটন, জেনন, রেডন এই ৬টি গ্যাসকে একত্রে নিষ্ক্রিয় গ্যাস বলা হয়।

হিলিয়াম ব্যতীত অন্য নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলির বহিঃস্থ শক্তিস্তরে অষ্টক পূর্ণ থাকে। এজন্যে নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলি অন্য কোন মৌলের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে না।

অর্থাৎ এরা স্বাধীনভাবে অবস্থান করে। নিষ্ক্রয় গ্যাসগুলির ধর্ম অন্য মৌল থেকে পৃথক হওয়ায় এদের অভিজাত গ্যাস বলা হয়।

 

হিলিয়াম এর নিষ্ক্রিয়তার কারণ কি?

উত্তরঃ হিলিয়াম একটি নিষ্ক্রিয় গ্যাস। কারণ, হিলিয়ামের ইলেকট্রন বিন্যাসে 1s অরবিটাল ইলেকট্রন দ্বারা পূর্ণ থাকে। প্রথম পর্যায়ের ক্ষেত্রে অন্য কোন অরবিটাল না থাকায় এবং s-অরবিটাল ইলেকট্রন দ্বারা পূর্ণ থাকায় হিলিয়াম মৌলটি অন্য কোন মৌল এমনকি আরেকটি হিলিয়াম এর সাথে যুক্ত হতে পারে না। ইলেকট্রন দান বা গ্রহণ এবং শেয়ারের মাধ্যমে যৌগ গঠন করতে পারে না বলে হিলিয়াম একটি নিষ্ক্রিয় গ্যাস।

 

শেষ কথা:
আশা করি আপনাদের এই আর্টিকেলটি পছন্দ হয়েছে। আমি সর্বদা চেষ্টা করি যেন আপনারা সঠিক তথ্যটি খুজে পান। যদি আপনাদের এই “নিষ্ক্রিয় গ্যাস কাকে বলে?” আর্টিকেলটি পছন্দ হয়ে থাকলে, অবশ্যই ৫ স্টার রেটিং দিবেন।

5/5 - (34 votes)