সমাজবিজ্ঞান
1 min read

সরকার কি | সরকার কাকে বলে | সরকারের প্রকারভেদ

সাধারণভাবে যাদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার ভার ন্যস্ত থাকে সমষ্টিগতভাবে তাকে সরকার বলে। সরকার রাষ্ট্রের ইচ্ছাকে রূপায়িত করে এবং আইনের সাহায্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বিধান করে। বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিভিন্ন সময় সরকারের সংজ্ঞা দান করেছেন ।

নিম্নে তাদের দেয়া কয়েকটি প্রামাণ্য সংজ্ঞা তুলে ধরা হল ঃ

(i) অধ্যাপক উইলোবি বলেন, “সরকার হল একটি প্রতিষ্ঠান যার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার ইচ্ছাকে গঠন ও কার্যকর করে।”

(ii)অধ্যাপক গার্নার বলেন, “সরকার হল একটি কার্যনির্বাহী মাধ্যম যার দ্বারা সরকারের সাধারণ নীতি নির্ধারিত হয় এবং যার দ্বারা সাধারণ কাজকর্ম নিয়ন্ত্রিত হয় এবং সাধারণ স্বার্থ সাধিত হয়।”

(iii) Jack L. Walker-এর মতে, “Democracy is a method of making decision which insures efficiency in administration and policy making and yet requires some measures of responsiveness to popular opinion on the part of the ruling elites.

সরকার কি

সরকার হল একটি প্রতিষ্ঠান বা একটি সিস্টেম যা একটি দেশ বা রাষ্ট্রের পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে। প্রতিটি সরকারের নিজস্ব সংবিধান আছে যার মাধ্যমে সেই দেশ বা জাতি পরিচালিত হয়। সরকার জনগণের মৌলিক অধিকার, আইন, সামাজিক, রাজনৈতিক, এবং অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার কাজে নিয়োজিত থাকে।
বিভিন্ন পন্ডিত সরকারের সংজ্ঞা বিভিন্নভাবে দিলেও তাদের প্রকৃত কাজ একই থাকে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা, নাগরিকদের অধিকার, এবং আইন প্রয়োগে ভূমিকা রাখা। বর্তমানে, বিশ্বে বিভিন্ন ধরণের সরকার ব্যবস্থা বিদ্যামান রয়েছে। এর মধ্যে কিছু রয়েছে এককেন্দ্রীক, কিছু যুক্তরাষ্ট্রীয় ইত্যাদি।
 

সরকারের সংজ্ঞা

সরকার হল সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থা যার দ্বারা একটি দেশ বা সম্প্রদায়কে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত করা হয়।
সরকার হল একটি ব্যবস্থা বা জনগণের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, যারা একটি সংগঠিত সম্প্রদায়কে পরিচালনা করে। অধিকাংশ সরকার সাধারণত আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগ নিয়ে গঠিত।
সরকার হল একটি প্রতিষ্ঠান বা একটি সিস্টেম যা একটি দেশ বা রাষ্ট্রের পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে।

সুতরাং, দেশ পরিচালনার জন্য নিয়োজিত কর্মকর্তাগণ বা দেশের জনগণ দ্বারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণকে সরকার বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে।

সরকারের প্রকারভেদ

ক্ষমতা বন্টনের নীতির ভিত্তিতে সরকার দুই ধরনের যথা-
এককেন্দ্রিক সরকার, এবং
যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার

১.  এককেন্দ্রিক সরকার

শাসনক্ষমতা বণ্টনের ভিত্তিতে সরকারকে এককেন্দ্রিক (unitary) এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় (federal)- এই দু-ভাগে বিভক্ত করা হয়।

এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা বলতে এমন এক শাসনব্যবস্থাকে বােঝায় যেখানে সরকারি ক্ষমতা একটিমাত্র কর্তৃপক্ষ বা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকে। সাধারণত এই ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার ছাড়া অন্য কোনাে সরকারের অস্তিত্ব থাকে না। তবে শাসনকাজের সুবিধার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার এক বা একাধিক আঞ্চলিক সরকার গঠন করতে পারে। এইসব আঞ্চলিক সরকারের নিজস্ব কোনাে ক্ষমতা বা স্বাতন্ত্র্য থাকে না। এদের ক্ষমতা ও অস্তিত্ব সম্পূর্ণরূপেই কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভরশীল। অধ্যাপক গার্নারের মতে, যে শাসনব্যবস্থায় সমস্ত ক্ষমতা সংবিধানের মাধ্যমে একটিমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকে, তাকে এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা বলা হয়। অধ্যাপক ডাইসি এককেন্দ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে একটিমাত্র কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব দ্বারা চূড়ান্ত আইনগত ক্ষমতার স্বাভাবিক প্রয়ােগ বলে অভিহিত করেন।

এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার উদাহরণ হিসেবে গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, নিউজিল্যান্ড, ইতালি, চিন, জাপান প্রভৃতি দেশের কথা উল্লেখ করা যায়।

এককেন্দ্রিক সরকারের বৈশিষ্ট্যসমূহ

[1] কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাধান্য: এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকারের চূড়ান্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকায় সমগ্র দেশে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। অবশ্য প্রশাসনের সুবিধার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার কয়েকটি আঞ্চলিক সরকার ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান গঠন করতে পারে। এইসব সরকারের স্বাধীন অস্তিত্ব বলে কিছু থাকে না। কেন্দ্রীয় সরকার প্রয়ােজন হলে এদের ক্ষমতার হ্রাস, বৃদ্ধি, এমনকি বিলুপ্তিও ঘটাতে সক্ষম। স্থানীয় সরকারগুলির প্রধান কাজ হল কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক অর্পিত দায়দায়িত্ব পালন করা।

[2] কেন্দ্রীয় আইনসভার প্রাধান্য: অধ্যাপক ডাইসির মতে, কেন্দ্রীয় আইনসভার প্রাধান্য এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। কেন্দ্রীয় আইনসভা এই শাসনব্যবস্থায় সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। যে কোনাে ধরনের আইন প্রণয়ন এবং প্রচলিত আইন সংশোধন বা বাতিল করার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় আইনসভা ভোগ করে থাকে। বস্তুতপক্ষে, এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় সংবিধানের প্রাধান্যের পরিবর্তে আইনসভার প্রাধান্য বজায় থাকে। কেন্দ্রীয় আইনসভা প্রয়ােজন হলে সংবিধানে যে কোনাে ধরনের রদবদল করতে পারে।

[3] সুপরিবর্তনীয় সংবিধান: এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় সংবিধান সুপরিবর্তনীয় হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় আইনসভা শুধুমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থনের ভিত্তিতে সংবিধান সংশােধন করতে পারে। এজন্য কোনাে বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বনের দরকার পড়ে না।

[4] ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ: এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় সাধারণত ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটে। কেন্দ্রীয় সরকারের হাতেই যাবতীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে।

[5] লিখিত বা অলিখিত সংবিধান: এককেন্দ্রিক সরকারের সংবিধান লিখিত বা অলিখিত, দুই ই হতে পারে। যেমন, ব্রিটেনের সংবিধান মূলত অলিখিত; অন্যদিকে ফ্রান্স, চিন ও নিউজিল্যান্ডের সংবিধান লিখিত।

[6] বিচার বিভাগের গুরুত্বহীনতা: এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় সংবিধানের প্রাধান্য না থাকায় বিচার বিভাগ দুর্বল হয়। সংবিধানের অভিভাবক এবং ব্যাখ্যাকর্তা হিসেবে বিচার বিভাগের গুরুত্ব এখানে অস্বীকৃত। প্রকৃতপক্ষে আইন বিভাগের প্রাধান্য মেনে নিয়েই এখানে বিচার বিভাগ কাজ করে থাকে।

[7] একনাগরিকত্বের স্বীকৃতি: এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় একনাগরিকত্বের নীতি অনুসৃত হয়। গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি দেশে আঞ্চলিক সরকারগুলির অধীনস্থ অধিবাসীদের জন্য আলাদা কোনাে নাগরিকত্বের ব্যবস্থা নেই।

[8] সার্বভৌম ক্ষমতার সুস্পষ্ট অবস্থান: এককেন্দ্রিক সরকারে সার্বভৌমিকতার অবস্থান সুস্পষ্ট। এখানে কেন্দ্রীয় সরকার এককভাবে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনাে প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। আঞ্চলিক সরকার বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলি প্রশাসনে যুক্ত থাকলেও, সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিকারী নয়।

২. যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার (Federal Government)
যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থা হচ্ছে সেই পদ্ধতি যেখানে একাধিক অঞ্চল বা প্রদেশ নিয়ে একটি সরকার গঠন করে। মূলত ক্ষমতা বন্টনের নীতির উপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার। এ-ধরণের সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব কিছু অংশ প্রদেশ বা রাজ্যের অধীনে থাকে বাকিগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের প্রধান বা কেন্দ্র চাইলেই তার প্রদেশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারে না। এর জন্যে প্রয়োজন হয় উক্ত প্রদেশের প্রতিনিধিদের ভোট এবং জাতীয় পরিষদের সমর্থন।
যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের উদাহরণ: আমেরিকা, ভারত, কানাডা প্রভূতি দেশে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার পদ্ধতি রয়েছে।
আইন ও শাসন বিভাগের সম্পর্কের ভিত্তিতে সরকার দুই ধরণের।
সংসদীয় সরকার, এবং
রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার
১. সংসদীয় সরকার (Parliamentary Government)
যে সরকার ব্যবস্থায় শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং শাসন বিভাগের কার্যকারিতা আইন বিভাগের উপর নির্ভরশীল তাকে সংসদীয় সরকার বা মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার বলে। এ-ধরণের সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের মূল ক্ষমতা থাকে মন্ত্রিপরিষদের হাতে যারা একজন আস্থাভাজন প্রধানমন্ত্রি নিয়োগ করে। এসব মন্ত্রিগণ সংসদের মাধ্যমে নির্বাচিত বা মনোনীত হন। তাই এ সরকারকে বলা হয় সংসদীয় সরকার।
সংসদীয় সরকারের আইনসভা একমাত্র সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়। প্রধানমন্ত্রি ও তার মন্ত্রিসভা প্রকৃতপক্ষে আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ তাকে। সংসদে যে কারো বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করলে তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় সেটা মন্ত্রি হোক বা যেকেউ।
সংসদীয় সরকারের একজন রাষ্ট্রপতি থাকেন যিনি নামমাত্র ক্ষমতা প্রাপ্ত হন। মূল ক্ষমতা প্রয়োগ করে প্রধানমন্ত্রি ও তার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, ভারত, কানাডা, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া প্রভূতি রাষ্ট্রে সংসদীয় সরকার পদ্ধতি রয়েছে।
২. রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার (Presidential Government)
রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার হচ্ছে সেই সরকার ব্যবস্থা যেখানে শাসন বিভাগ তার কাজের জন্য আইন বিভাগের নিকট দায়ী থাকে না। রাষ্ট্রপতি তার পছন্দমতো ব্যক্তিদের নিয়ে তার মন্ত্রিসভা গঠন করে। এক্ষেত্রে মন্ত্রিসভার সদস্যদের সংসদ সদস্য না হলেও চলবে। এ-ধরণের সরকার ব্যবস্থায় মন্ত্রিগণ তাদের কাজের জন্য রাষ্ট্রপতির নিকট দায়ী থাকে।
রাষ্ট্রপতির সন্তুষ্টির উপর মন্ত্রিদের কার্যকাল নির্ভর করে। একমাত্র রাষ্ট্রপতি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয় এবং তিনি প্রকৃত শাসক ও সরকার প্রধান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা বিদ্যামান রয়েছে।

 

শেষ কথা:
আশা করি আপনাদের এই আর্টিকেলটি পছন্দ হয়েছে। আমি সর্বদা চেষ্টা করি যেন আপনারা সঠিক তথ্যটি খুজে পান। যদি আপনাদের এই “সরকার কি | সরকার কাকে বলে” আর্টিকেলটি পছন্দ হয়ে থাকলে, অবশ্যই ৫ স্টার রেটিং দিবেন।

5/5 - (37 votes)