পড়াশোনা
1 min read

ধ্বনি কাকে বলে? ধ্বনি কত প্রকার ও কি কি?

Updated On :

কোনো ভাষার উচ্চারিত শব্দকে বিশ্লেষণ করলে যে উপাদানসমূহ পাওয়া যায় সেগুলোকে পৃথকভাবে ধ্বনি বলে। ধ্বনির সঙ্গে সাধারণত অর্থের সংশ্লিষ্টতা থাকে না, ধ্বনি তৈরি হয় বাগ্যন্ত্রের সাহায্যে। ধ্বনি তৈরিতে যেসব বাগ্-প্রত্যঙ্গ সহায়তা করে সেগুলো হলো ফুসফুস, গলনালি, জিহ্বা, তালু, মাড়ি, দাঁত, ঠোঁট, নাক ইত্যাদি।

মানুষ ফুসফুসের সাহায্যে শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করে। ফুসফুস থেকে বাতাস বাইরে আসার সময় মুখের বিভিন্ন জায়গায় বাধা পায়। ফলে মুখে নানা ধরনের ধ্বনির সৃষ্টি হয়। তবে সব ধ্বনিই সব ভাষা গ্রহণ করে না।

বাংলা ভাষায় ব্যবহূত ধ্বনিগুলোকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয় :

  • স্বরধ্বনি
  • ব্যঞ্জনধ্বনি।

স্বরধ্বনি:

যে ধ্বনি অন্য ধ্বনির সাহায্য ছাড়া নিজেই সম্পূর্ণভাবে উচ্চারিত হয় এবং যাকে আশ্রয় করে অন্য ধ্বনির সৃজন হয়, তাকে স্বরধ্বনি বলে। বাংলা ভাষায় মৌলিক স্বরধ্বনি সাতটি। যথা অ, আ, ই, উ, এ, ও, অ্যা।

স্বরধ্বনির উচ্চারণ

ই এবং ঈ-ধ্বনির উচ্চারণে জিহবা এগিয়ে আসে এবং উচ্চে অগ্রতালুর কঠিনাংশের কাছাকাছি পৌছে। এ ধ্বনির উচ্চারণে জিহবার অবস্থান ই-ধ্বনির মতাে সম্মুখেই হয়, কিন্তু একটু নিচে এবং আ-ধ্বনির বেলায় আরও নিচে। ই ঈ এ (অ) ধ্বনির উচ্চারণে জিহবা এগিয়ে সম্মুখভাগে দাঁতের দিকে আসে বলে এগুলােকে বলা হয় সম্মুখ ধ্বনি। ই এবং ঈ-র উচ্চারণের কেলায় জিহবা উচ্চে থাকে। তাই এগুলাে উচ্চসম্মুখ স্বরধ্বনি। এ মধ্যাবস্ধিত সম্মুখ স্বরধ্বনি এবং অ নিম্নাবস্থিত সম্মুখ স্বরধ্বনি।

উ এবং উ-ধ্বনি উচ্চারণে জিহ্বা পিছিয়ে আসে এবং পশ্চাৎ তালুর কোমল অংশের কাছাকাছি ওঠে। ও-ধ্বনির উচ্চারণে জিহবা আরও একটু নিচে আসে। অ-ধ্বনির বেলায় তার চেয়েও নিচে আসে। উ উ ও অ-ধ্বনির উচ্চারণে জিহবা পিছিয়ে আসে বলে এগুলােকে পশ্চাৎ স্বরধ্বনি কলা হয়। উ ও উ-ধ্বনির উচ্চারণকালে জিহ্বা উচ্চে থাকে বলে এদের কলা হয় উচ্চ পশ্চাৎ স্রধ্বনি ও মধ্যাবস্থিত পশ্চাৎ সবরধ্বনি এবং অ-নিয্নাবস্থিত পশ্চাৎ স্বরধ্বনি।

বাংলা আ-ধ্বনির উচ্চারণে জিহবা সাধারণত শায়িত অবস্থায় থাকে এবং কণ্ঠের দিকে আকৃষ্ট হয় এবং মুখের সম্মুখ ও পশ্চাৎ অংশের মাঝামাঝি বা কেন্দ্রস্থানীয় অংশে অবস্থিত বলে আ-কে কেন্দ্রীয় নিম্নাবস্থিত স্বরধ্বনি এবং বিবৃত ধ্বনিও বলা হয়।

বাংলা স্বরধ্বনির উচ্চারণ নিচের ছবিতে দেখানো হলো

ব্যঞ্জনধ্বনি:

যে ধ্বনি স্বরধ্বনির সাহায্য ছাড়া স্পষ্টরূপে উচ্চারিত হতে পারে না এবং যে ধ্বনি সাধারণত অন্য ধ্বনিকে আশ্রয় করে উচ্চারিত হয়, তাকে ব্যঞ্জনধ্বনি বলে। যেমন: ক্, খ্, গ্, ঘ্, প্, স্, ইত্যাদি। এই ধ্বনিগুলোকে প্রকৃষ্টভাবে শ্রুতিযোগ্য করে উচ্চারণ করতে হলে স্বরধ্বনির আশ্রয় নিতে হয়। যেমন: (ক্+অ=) ক; (গ্+অ=) গ; (প্+অ=) প ইত্যাদি।

উচ্চারণের স্থানতেদে ব্যঞ্জনধ্বনির বিভাগ

ধ্বনি উৎপাদনের ক্ষেত্রে মুখবিবরে উচ্চারণের মূল উপকরণ বা উচ্চারক জিহবা ও ওষ্ঠ। আর উচ্চারণের স্থান হলাে কণ্ঠ বা জিহ্বামূল, অগ্রতালু, মূর্ধা বা পশ্চাৎ দন্তমূল, দন্ত বা অগ্র দন্তমূল, ওষ্ঠ্য ইত্যাদি।

উচ্চারণের স্থানের নাম অনুসারে ব্যঞ্জনধ্বনিগুলাকে পাঁচ তাগে ভাগ করা হয় :

  • কণ্ঠ্য বা জিহ্বামূলীয়
  • তালব্য বা অগ্রতালুজাত,
  • মূর্ধন্য বা পশ্চাৎ দন্তমূলীয়,
  • দন্ত্য বা অগ্র দন্তমূলীয় এবং
  • ওষ্ঠ্য।

ধ্বনি উচ্চারণের জন্য যে প্রত্যঙ্গ গুলাে ব্যবহৃত হয়ঃ

নিচে উচ্চারণ স্থান অনুযায়ী বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনি বিভাজন দেখানো হলো

প্রষ্টব্য : খণ্ড-ত (ৎ)-কে স্বতন্ত্র বর্ণ হিসেবে ধরা হয় না। এটি ত বর্ণের হস-চিহ্ন যুক্ত (ত্)-এর বূপভেদ মাত্র।

ং : এ তিনটি বর্ণ স্বাধীনভাবে স্বতন্ত্র বর্ণ হিসেবে ভাষায় ব্যবহৃত হয় না। এ বর্ণে দ্যোতিত ধ্বনি অন্য ধ্বনির সঙ্গে মিলিত হয়ে একত্রে উচ্চারিত হয়। তাই এ বর্ণগুলােকে বলা হয় পরাশ্রয়ী বর্ণ।

ঙ ঞ ণ ন ম-এ পাঁচটি বর্ণ এবং ং ঃ যে বর্ণের সঙ্গে লিখিত হয় সে বর্ণে দ্যোতিত ধ্বনি উচ্চারণের সময় ফুসফুস নিঃসৃত বায়ু মুখবিবর ছাড়াও নাসারস্ত্র দিয়ে বের হয়; অর্থাৎ এগুলাের উচ্চারণে নাসিকার সাহায্য প্রয়ােজন হয়। তাই এগুলােকে বলে অনুনাসিক বা নাসিক্য ধ্বনি। আর এগুলাের বর্ণকে বলা হয় অনুনাসিক বা নাসিক্য বর্ণ।

সরধ্বনির ক্রস্বতা ও দীর্ঘতা : স্বরধ্বনি উচ্চারণকালে সময়ের স্বন্সতা ও দৈর্ঘ্য অনুসারে ক্রস্ব বা দীর্ঘ হয়। যেমন- ইংরেজি full-পূর্ণ এবং fool বােকা। শব্দ দুটোর প্রথমটির উচ্চারণ ত্রস্ব ও দ্বিতীয়টির উচ্চারণ দীর্ঘ। জ্রসব বর্ণের উচ্চারণ যে দীর্ঘ হয় এবং দীর্ঘ বর্ণের উচ্চারণ যে হ্রস্ব হয়, কয়েকটি উদাহরণে তা স্পষ্ট হবে। যেমন-ইলিশ, তিরিশ, উচিত, নতুন-লিখিত হয়েছে ত্রসব ই-কার ও ক্রস্ব – উ-কার দিয়ে; কিন্তু উচ্চারণ হচ্ছে দীর্ঘ। আবার দীন, ঈদুল ফির, ভূমি-লিখিত হয়েছে দীর্ঘ ঈ-কার এবং দীর্ঘ উ-কার দিয়ে; কিন্তু উচ্চারণে ক্রসব হয়ে যাচ্ছে। একটিমাত্র ধ্বনিবিশিষ্ট শব্দের উচ্চারণ সবসময় দীর্ঘ হয়। যেমন-দিন, তিল, পুর ইত্যাদি।

যৌগিক স্বর : পাশাপাশি দুটি স্বরধ্বনি থাকলে দ্রুত উচ্চারণের সময় তা একটি সংযুক্ত স্বরধ্বনি বূপে উচ্চারিত হয়। এরুপে একসঙ্গে উচ্চারিত দুটো মিলিত স্বরধ্বনিকে যৌগিক স্বর বা দবি-স্বর বলা হয়। যেমন-অ + ই অই (বই), অ + উ = অউ (বউ), অ + এ = অয়, (বয়, ময়না), অ + ও = অও (হও, লও)।

বাংলা ভাষায় যৌগিক স্বরধ্বনির সংখ্যা পঁচিশ।

আ + ই = আই (যাই, তাই); আ + উ = আউ (লাউ); আ + এ = আয় (যায়, খায়); আ + ও = আও (যাও, খাও); ই + ই – ইই (দিই); ই + উ – ইউ (শিউলি); ই + এ = ইয়ে (বিয়ে); ই + ও = ইও (নিও, দিও); উ+ ই = উই (উই, শুই); উ + আ = উয়া (কুয়া); এ + আ=এয়া (কেয়া, দেয়া); এ + ই = এই (সেই, নেই); এ + ও = এও (খেও); ও + ও = ওও (শােও)।

বাংলা বর্ণমালায় যৌগিক স্বরজ্ঞাপক দুটো বর্ণ রয়েছে: ঐ এবং ঔ। উদাহরণ : কৈ, বৌ। অন্য যৌগিক স্বরের চিহ্ন স্বরূপ কোনাে বর্ণ নেই।

ব্যঞ্জনধ্বনির বিভাগ ও উচ্চারণগত নাম

আগে আমরা দেখেছি যে, পাঁচটি বর্গ বা গুচ্ছে প্রত্যকটিতে পাঁচটি বর্ণ পাওয়া যায়। এগুলাে স্পৃষ্ট ধ্বনিজ্ঞাপক। ক থেকে ম পর্যন্ত এ পঁচিশটি ব্যঞ্জনকে স্পর্শ ব্যঞ্জন বা স্পৃষ্ট ব্যঞ্জনধ্বনি বলে।

উচ্চারণ বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী স্পর্শ ব্যঞ্জনধ্বনিগুলােকে প্রথমত দুই ভাগে ভাগ করা যায় :

  • অঘােষ এবং
  • ঘােষ।

অঘােষ : যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় স্বরতন্ত্রী অনুরণিত হয় না, তাকে বলা হয় অঘােষ ধ্বনি। যেমন- ক, খ, চ, ছ ইত্যাদি।

ঘােষ : যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় স্বরতন্ত্রী অনুরণিত হয়, তাকে বলে ঘােষ ধ্বনি। যেমন-গ, ঘ, জ, ঝ ইত্যাদি।

এগুলােকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায় :

  • অল্প্রাণ এবং
  • মহাপ্রাণ।

অল্প্রাণ : যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় বাতাসের চাপের স্বল্পতা থাকে, তাকে বলা হয় অল্প্রাণ ধ্বনি। যেমন-ক, গ, চ, জ ইত্যাদি।

মহাপ্রাণ : যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় বাতাসের চাপের আধিক্য থাকে, তাকে কলা হয় মহাপ্রাণ ধ্বনি। যেমন-খ, ঘ, ছ, ঝ ইত্যাদি।

উম্মধ্বনি : শ, য, স, হ – এ চারটি বর্ণে দ্যোতিত ধ্বনি উচ্চারণের সময় আমরা শ্বাস যতক্ষণ খুশি রাখতে পারি। এগুলােকে বলা হয় উম্মধ্বনি বা শিশধ্বনি। এ বর্ণগুলােকে বলা হয় উম্মবর্ণ।

শ ষ স – এ তিনটি বর্ণে দ্যোতিত ধ্বনি অঘােষ অল্প্রাণ, আর “হ” ঘােষ মহাপ্রাণ ধ্বনি।

অন্তঃস্থ ধ্বনি : যু (Y) এবং বু (W) এ দুটো বর্ণে দ্যোতিত ধ্বনির উচ্চারণ স্থান স্পর্শ ও উম্মধ্বনির মাঝামাঝি। এজন্য এদের বলা হয় অন্তঃস্থ ধ্বনি।

ধ্বনি সম্পর্কিত কিছু প্রশ্ন

2-ধ্বনি ও বর্ণের মধ্যে একটি পার্থক্য লেখ।

উ-ধ্বনি কেবলমাত্র শোনা যায়,কিন্তু দেখা যায় না। আবার বর্ণ চোখে দেখা যায়।

3-ধ্বনিতত্ত্বের আলোচ্য বিষয় কি?

উ-ধ্বনিতত্ত্বের মূল আলোচ্য বিষয় হল বাগধ্বনি অর্থাৎ মুখের ভাষা।

4-বাগধ্বনি প্রধানত কয় প্রকার ও কি কি?

উ-বাগধ্বনি মূলত দুই প্রকার ।যথা- বিভাজ্য ধ্বনি এবং অবিভাজ্য ধ্বনি।

5-মৌলিক স্বরধ্বনি কয়টি ও কি কি?

উ-মৌলিক স্বরধ্বনি হলো ৭ টি।যথা -অ,আ,ই,উ,এ,ও,অ্যাশ

6-মৌলিক স্বরধ্বনি কাকে বলে ?

উ-যে সকল স্বরধ্বনিকে বিশ্লেষণ করা যায়না তথা ভাঙা যায় না,তাদের মৌলিক স্বরধ্বনি বলে ।

7-ঘোষীভবন কী?

উ-অনেক সময় উচ্চারণকালে অঘোষধ্বনি ধ্বনি ঘোষধ্বনিতে পরিণত হয় ,একেই ঘোষীভবন বলে।

8-গুচ্ছধ্বনি কাকে বলে ?

উ-পাশাপাশি উচ্চারিত দুটি ব্যঞ্জনধ্বনির সমাবেশকে গুচ্ছধ্বনি বলে।

9-যুক্তধ্বনি বলতে কী বোঝো?

উ-যে ব্যঞ্জন সমষ্টিগুলি শব্দের আদিতে বা দলের শুরুতে উচ্চারিত হতে পারে ,তাদের যুক্তধ্বনি বলে।

10-অবিভাজ্য ধ্বনি কাকে বলে ?

উ-ভাষার যে ধ্বনি উপাদানগুলিকে কৃত্রিমভাবে খন্ড করা যায় না বা বিশ্লেষণ করা যায় না,তাদের অবিভাজ্য ধ্বনি বলে ।

11-সুরতরঙ্গ কাকে বলে?

উ-ভাষার ওঠা-নামার দ্বারা বাক্যের অর্থ নিয়ন্ত্রিত হলে তাকে সুরতরঙ্গ বলে।

12-ধ্বনিমূল কাকে বলে?

উ-যেসব ধ্বনির বৈচিত্র্যময় উচ্চারণ থাকে,তাদের ধ্বনিমূল বলে।

 

শেষ কথা:
আশা করি আপনাদের এই আর্টিকেলটি পছন্দ হয়েছে। আমি সর্বদা চেষ্টা করি যেন আপনারা সঠিক তথ্যটি খুজে পান। যদি আপনাদের এই “ধ্বনি কাকে বলে? ধ্বনি কত প্রকার ও কি কি?” আর্টিকেলটি পছন্দ হয়ে থাকলে, অবশ্যই ৫ স্টার রেটিং দিবেন।

5/5 - (41 votes)