মার্কেটিং
1 min read

বাজারজাতকরণের গুরুত্ব/ প্রয়োজনীয়তা

কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে বাজারজাতকরণের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত আমরা বাজারজাতকরণের উপর নির্ভর করছি। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের চাবিকাঠি হচ্ছে বাজারজাতকরণ। সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের জীবনযাত্রার মান যত বেশি উন্নত হচ্ছে, বাজারজাতকরণ ততবেশি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নিম্নে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বাজারজাতকরণের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলো –

বাজারজাতকরণ

পণ্য ও সেবা কর্মের উৎপাদনঃ বাজারজাতকরণ প্রতিনিয়ত দ্রব্য, সেবা, ধারণা সৃষ্টি এবং তথ্যের স্থানান্তর করার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানব সমাজের প্রয়োজনের তাগিদেই কৃষি ক্ষেত্রে বন, খনি, মৎস্য খামার ইত্যাদি থেকে প্রাপ্ত সম্পদসমূহ ব্যবহারোপযোগী দ্রব্যসামগ্রীতে রূপান্তরিত করার জন্য বিভিন্ন কলকারখানায় স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তীতে ওইসব রূপান্তারিত পণ্য সামগ্রীকে বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে ভোক্তাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়ে বাজারজাতকরণ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

অর্থনৈতিক উন্নয়নঃ কোনো দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে সুদুঢ় করে গড়ে তোলার জন্য বাজারজাতকরণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। দক্ষ ও সফল বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের উৎপাদন, ভোগ, কর্মসংস্থান, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ শক্তিশালী ও সুদৃঢ় হয়।

আকৃতিগত উপযোগ সৃষ্টিঃ আপাদদৃষ্টিতে পণ্যের আকৃতিগত উপযোগ সৃষ্টিতে উৎপাদনের ভূমিকা থাকলেও বর্তমানে এতে বাজারজাতকরণের ভূমিকা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গবেষণার মাধ্যমে বাজারজাতকারীরা ভোক্তাদের পছন্দ ও রুচি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে উৎপাদনকে প্রদান করে। যেমনঃ পণ্যের রং, আকৃতি, ডিজাইন, মোড়কে কী পরিমাণ তথ্য থাকবে ইত্যাদি।

বাজারজাতকরণ ও উদ্ভাবনঃ উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশে স্বল্প সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন এবং নতুন নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা মানুষের উপকার সাধন করতে হলে বাজারজাতকরণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। বাজারজাতকরণ প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের পর তা বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবহারোপযোগী দ্রব্যে রূপান্তর প্রাকৃতিক সম্পদের নিত্য নতুন ব্যবহার ও উদ্ভাবন সীমাবদ্ধ সম্পাদন কাম্য ব্যবহার নিশ্চিত করে থাকে।

 

স্থানগত উপযোগ সৃষ্টিঃ ভৌগলিক কারণে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য উৎপাদিত হয় বিভিন্ন বিশেষায়িত অঞ্চলে। যেমনঃ মুন্সীগঞ্জের আলু, ময়মনসিংহের পাট, সিলেটের চা ইত্যাদি। কিন্তু এসব পণ্যের ভোক্তা বিস্তৃত সারাদেশ জুড়ে। বাজারজাতকারীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পণ্য সংগ্রহ করে ভোক্তাদের প্রয়োজন ও চাহিদা অনুযায়ী সারাদেশে সরবরাহ করে পণ্যের স্থানগত উপযোগ সৃষ্টি করে।

বাজারজাতকরণ ও অর্থব্যবস্থাঃ আমরা বর্তমানে যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে জীবনযাপন করছি তা বাজারজাতকরণ হতে উদ্ভূত। পণ্যসামগ্রী উৎপন্ন হয় ক্রেতার জন্য; কিন্তু সেসব পণ্য যদি বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্রেতাদের নিকট পৌঁছতে না পারে তবে জনসাধারণ সেগুলো ক্রয়ে সক্ষম হবে না এবং ফলস্বরূপ সমগ্র অর্থ ব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে।

বাজারজাতকরণ ও অব্যাহত উৎপাদনঃ শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানায় উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হলে বাজারজাতকরণের প্রয়োজন অপরিহার্য। কারণ, বাজারজাতকরণ একদিকে যেমন উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছে দেয়, তেমনি অন্যদিকে ভোক্তাদের চাহিদা সম্পর্কে অবহিত করে উৎপাদনকারীদের উৎপাদন অব্যাহত রাখে। এর ফলে উৎপাদন ও চাহিদা তথা ভোগের মধ্যে সমন্বয় সাধিত হওয়ায় অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক মন্দা পরিহার করা সম্ভবপর হয়।

 

সময়গত উপযোগ সৃষ্টিঃ কতিপয় পণ্য রয়েছে যা বছরের নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদিত হয় কিন্তু এর চাহিদা রয়েছে সারা বছর। যেমন: আলু। আবার অনেক পণ্য রয়েছে যা সারা বছর উৎপাদিত হয় কিন্তু তা ব্যবহার হয় নির্দিষ্ট একটি মৌসুমে। যেমনঃ শীতের পোশাক। অর্থাৎ, উৎপাদন ও ভোগের মাঝে পর্যাপ্ত সময়ের ব্যবধান রয়েছে। বাজারজাতকরণ পণ্যের উৎপাদন ও ভোগের সময়গত ব্যবধান দূর করার জন্য গুদামজাতকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ফলে পণ্যের সময়গত উপযোগ সৃষ্টি হয়।

বাজারজাতকরণ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাঃ কোনো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও বাজারজাতকরণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কেননা এক্ষেত্রে দেশের উৎপাদনকারীদের জানতে হবে ক্রেতা বা ভোক্তাদের কী ধরনের পণ্যের অভাব আছে; তারা কোন জাতীয় পণ্য ক্রয়ে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে থাকে। অন্যদিকে ক্রেতাদেরও উৎপাদিত পণ্য সম্পর্কে অবহিত হতে হবে। বাজারজাকতকরণ প্রক্রিয়া ভোক্তা এবং উৎপাদনকারী উভয়কেই বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সরবরাহ করে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ভারসাম্য বজায় রাখতে চেষ্টা করে। এ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বা ভারসাম্য দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি পূর্বশর্ত।

 

বাজারজাতকরণ ও কর্মসংস্থানঃ বাজারজাতকরণের আর একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা হলো এটা একটি দেশের প্রচুর সংখ্যক লোকের কর্মসংস্থান করে। বাজারজাতকরণের ফলে বিভিন্ন মধ্যস্থ কারবার, ব্যাংক, বীমা, পরিবহন, গুদামজাতকরণ ও অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক লোক নিয়োজিত থেকে জীবনধারণ করতে পারে। বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা না থাকলে অনেক লোক বেকার হয়ে পড়তো এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যহত হতো।

তথ্যগত উপযোগ সৃষ্টিঃ Stanton, Etzel এবং Walker বলেন, “Information utility is crated by informing prospective buyer that a product exists.” পণ্য বিক্রয়ে বাজারজাতকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো তথ্যগত উপযোগ সৃষ্টিতে ও বাজারজাতকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাজারজাতকরণ সাধারণত দু’ভাবে তথ্য উপযোগ সৃষ্টি করে থাকে।

প্রথমত, বাজারজাতকারীরা নতুন পণ্য বাজারে আসার পূর্বেই ভোক্তারা ঐ পণ্যের উপযোগিতা ও প্রাপ্তি সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে।

দ্বিতীয়ত, বাজারজাতকরণ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে বহু পণ্যের মধ্যে নিজস্ব পণ্যের গুণাবলী তুলে ধরে পণ্যের আকর্ষণ বৃদ্ধি করে বিক্রির লক্ষ্য পূরণ করে।

 

কৃষি ও শিল্পের উন্নয়নঃ একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সেদেশের কৃষি ও শিল্পখাতের উন্নয়নের উপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। বাজারজাতকরণ কৃষি খাতের উৎপাদিত পণ্য শিল্পখাতে এবং শিল্পখাতের উৎপাদিত পণ্য কৃষিখাতে যোগান দিয়ে উভয় খাতকে সমানভাবে উন্নত করে তুলেছে।

বাজারজাতকরণ ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নঃ বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা আমাদের দৈনন্দিন ভোগের তালিকায় নিত্য নতুন পণ্যের যোগান দিয়ে আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়তা করে থাকে। তাই পল মাজুর যথাযথই বলেছেন, “বাজারজাতকরণ জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়ক।”

বাজারজাতকরণ ও সুষ্ঠু বাণিজ্যিক পরিবেশঃ বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা উন্নয়নশীল দেশে বাণিজ্যিক শৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান হাতিয়ার। বৃহদায়তন উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের বিপুল দ্রব্যাদি বাজারে বিক্রয়ের জন্য প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হয়। সেজন্য দরকার দক্ষ বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠান এবং উপযুক্ত গুদামজাতকরণ ব্যবস্থা। এদিক থেকে বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা দেশের বাণিজ্যিক পরিবেশের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা রক্ষা করে ও অর্থনৈতিক উন্নতিতে সহায়তা করে।

 

চাহিদা ও যোগানের সমতায়নঃ বাজারজাতকরণ বাজারে পণ্যের চাহিদা ও যোগানের সমতা বিধান করে। বাণিজ্যিক বাজারজাতকরণের উৎকর্ষের যুগে ভোক্তা ও উৎপাদনকারীরা পরস্পর দূরে অবস্থান করে। উৎপাদকদের পক্ষে চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের যোগান দেয়া অসম্ভব। এক্ষেত্রে বাজারজাতকারীগণ ক্রেতা ও উৎপাদনকারীদের মাঝে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে চাহিদা ও যোগান সমতা বিধান করে।

সামাজিক কল্যাণঃ বর্তমান কালে বাজারজাতকরণ সমাজের জন্য বিভিন্ন উপকারী ধারনাত্ত মতবাদ প্রচার করে প্রভূত সামাজিক কল্যাণ সাধান করে যাচ্ছে। যেমন- ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, আপনার শিশুকে টিকা দিন, বেশি করে গাছ লাগান ইত্যাদি।

পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান মানব সভ্যতায় বাজারজাতকরণের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। দিন দিন বাজারজাতকরণের গুরুত্ব ব্যক্তিগত, সামাজিক ও দেশীয় পরিমণ্ডল ছেড়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিস্তার করছে। বাজারজাতকরণ ছাড়া বর্তমান ব্যবসায় – বাণিজ্যের কথা চিন্তাই করা যায় না। তাই বলা হয়, আধুনিক ব্যবসায় – বাণিজ্যের চালিকাশক্তি হচ্ছে বাজারজাতকরণ।

4/5 - (1 vote)