মোবাইল ফোনের ব্যবহার ও অপব্যবহার

83

মোবাইল ফোনের ব্যবহার ও অপব্যবহার

বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কার গুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে মোবাইল ফোন। মোবাইল (Mobile) শব্দটি ইংরেজি। এর অর্থ হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ,চলনশীল। সহজে বহন এবং যে কোন যে কোন স্থানে ব্যবহার করা যায় বলেই এর নামকরণ মোবাইল ফোন করা হয়েছে। বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোনের সাথে আমরা সবাই পরিচিত।

দৈনন্দিন জীবনে মোবাইল ফোনের ব্যবহারঃ

বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন মানুষের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখন মানুষ সময় দেখা থেকে শুরু করে ক্যালকুলেটর,অডিও,ভিডিও,ভ্রমণ, শিক্ষা,চিকিৎসাসহ প্রায় সব ধরনের সেবা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নিয়ে থাকে।নিম্নে এর বিস্তারিত আলোচনা করা হলোঃ

শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যবহারঃ

একটা সময় ছিল যখন দেশের গ্রামগুলোতে শিক্ষকের দেখা তেমন একটা পাওয়া যেত না। গ্রামের ছেলে-মেয়েরা লেখা পড়ার পর্যাপ্ত সুযোগ পেত না।বর্তমানে মোবাইল ফোনের কারণে গ্রামে থেকেও ছাত্র/ছাত্রীরা দেশ সেরা বিশ্ববিদ্যালয়,কলেজের শিক্ষকদের ক্লাস ঘরে বসে করতে পারে। শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই অন্য রকম পাঠশালা,টেন মিনিট স্কুলের মতো বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফর্মের সেবা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে গ্রহণ করতে পারে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরণের অনলাইন কোর্স করে নিজেদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করে।বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেবা অনলাইনে নিতে পারে।

শিক্ষার্থীরা মোবাইল দিয়ে বিভিন্ন বইয়ের পিডিএফ ডাউনলোড করে পড়তে পারে।
প্লে স্টোর থেকে বিভিন্ন শিক্ষামূলক অ্যাপ্স ডাউনলোড করতে পারে।
বর্তমানে বিভিন্ন বই,পবিত্র কুরআন,সহীহ হাদিসগ্রন্থসহ,শিক্ষামূলক অডিও,ভিডিও অ্যাপ্স হিসেবে পাওয়া যায়।
শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই মোবাইল দিয়ে অ্যাপ্সগুলো ডাউনলোড করে সেবা নিতে পারে। লক্ষ্য করলেই দেখতে পারবেন এই করোনা পরিস্থিতিতে পড়াশোনা অনলাইন ভিত্তিক হয়ে পড়েছে।
মোবাইল ফোন ব্যবহার করেই শিক্ষার্থীরা স্কুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্লাস করছে এবং অনলাইন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে।
ছাত্র/ছাত্রীরা পরীক্ষার ফর্ম পূরণ,পরীক্ষার ফি প্রদান,ই-মেইলে তথ্য আদান-প্রদান সবকিছু মোবাইলের মাধ্যমে করতে পারে। অনলাইনে পড়াশোনার ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহারঃ

এখন ঘরে বসে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সেবা পাওয়া যায়। অতীতে মাইলের পর মাইল হেঁটে হাসপাতালে যেতে হত। তবুও হাসপাতালে গিয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার পাওয়া যেত না। কিন্তু, ঘরে বসে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া যায় মোবাইল ফোনের মাধ্যমে। একটা সময় ছিল যখন হঠাৎ করে কোন ব্যক্তি অসুস্ত হয়ে পড়লে তাকে হাসপালে নিয়ে যাওয়ার গাড়ি খুঁজতে খুঁজতে রোগী মারা যেত। তবুও রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি খুঁজে পাওয়া যেত না। কিন্তু, এখন মোবাইল দিয়ে একবার ফোন করলে মূহুর্তের মধ্যে এ্যাম্বুলেন্স এসে হাজির হয়ে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। বাংলাদেশের সরকার চালু করেছে টেলিমেডিসিন সেবা। যার মাধ্যমে গ্রাম প্যযায়ের রোগীরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফোন করে তাদের সমস্যার কথা ডাক্তারদের বলে সেবা নিতে পারে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন যে অভূতপূর্ন অবদান রেখেছে তাতে সন্দেহের ফোন অবকাশ নেই।

যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যবহারঃ

এই প্রজন্মের কোন ছেলেকে/ মেয়েকে যদি প্রশ্ন করেন ডাকপিয়ন কি? সে বলতে পারবেনা।যদি বইয়ে না পড়ে থাকে অথবা তার দাদা দাদির কাছে গল্প না শুনে থাকে। অথচ পূর্বে মানুষ মানুষের সাথে যোগাযোগ করতো চিঠির মাধ্যমে। ডাকপিয়ন একজনের পাঠানো চিঠি অন্যজনের নিকট পোঁছে দিতেন।মানুষ কবুতরের মাধ্যমেও চিঠি আদান-প্রদান করতো। ডাকপিয়ন অনেক পথ হেঁটে মানুষের চিঠি পৌঁছে দিতেন। মোবাইল ফোন আবিষ্কারের ফেন ডাকপিয়ন শব্দটির বিলুপ্ত ঘটেছে। মোবাইল ফোনের যাত্রাই শুরু হয়েছে যোগাযোগ ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটানোর মাধ্যমে। বর্তমানে স্মার্ট ফোনের সাথে ইন্টারনেট সংযোগ করলে মূহুর্তের মদ্যে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের তথ্য জানা যায়।সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে স্বল্প খরচে সবার সাথে সহজেই যোগাযোগ করা যায়। ইচ্ছে করলেই বাস, ট্রেন,বিমানের টিকিট সহজেই মোবাইলের মাধ্যমে ক্রয় করা যায়। নিজের প্রয়োজনে অনুযায়ী যে কোন সময়ে মানুষের সাথে কথা বলা যায়।গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অতিদ্রুত আদান-প্রদান করা যায়। কম খরচে এসএমএস এর মাধ্যমেও যে কোন সংবাদ আত্মীয় -স্বজন বন্ধু-বান্ধবী সকলের কাছে পৌঁছানো যায়।দ্রুত যোগাযোগের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনের গুরুত্ব অপরিসীম।

মোবাইল ফোনের বৈশিষ্ট্যঃ

মুঠো ফোন নির্মান কোম্পানিগুলো তাদের ফোন কে ব্যবহারকারীদের কাছে আকর্ষনীয়ভাবে তুলে ধরার জন্য প্রতিনিয়ত আকর্ষনীয় বৈশিষ্ট্য যোগ করেছে। মোবাইল ফোনের প্রাথমিক বৈশিষ্ট্যগুলো হলোঃ

প্রতিটি ফোনের একটি ব্যাটারী থাকে যা ফোনের শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে থাকে।
ভিন্ন ভিন্ন ফোনের জন্য একটি স্বতন্দ্র আইএমইআই (IMEI)থেকে যার মাধ্যমে ঐ ফোনটিকে শনাক্ত করা যায়।
প্রত্যেকটি GSM ফোনে একটি সিম কার্ড ব্যবহার করা হয়।
মোবাইল ফোনে কথা বলার এবং ম্যাসেজ আদান-প্রদান করার সুবিধা প্রদান করে।
স্মার্ট ফোনের টাচ স্ত্রিন ব্যবহার করে ইনপুটের কাজ করা যায়।
আধুনিক ফোর-জি প্রযুক্তির স্মার্ট ফোনে উচ্চগতির ট্রান্সফার রেট সর্বোচ্চ ২০ এমবিবিএস।
অতীতের মোবাইল ফোনগুলো নিম্মস্তরের ফোন এগুলোকে ফিচার ফোন বলা হয়। আর বর্তমানের আধুনিক ফোন গুলো আরও অগ্রসর সুবিধা প্রদান করে এগুলোকে স্মার্ট ফোন বলে। ফিচার ফোনের মাধ্যমে শুধুমাত্র দেয়।কিন্তু স্মার্ট ফোন কম্পিউটারের সদৃশ অনেক সেবা দেয়।

জনপ্রিয়তার কারণ :

সর্বস্তরেই মােবাইল ফোনের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে । মােবাইল ফোন এখন সমাজের উচ্চবিত্ত , মধ্যবিত্ত সবাই ব্যবহার করে । বর্তমান প্রজন্মের ছেলে – মেয়েদরে কাছে মােবাইল ফোনের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে । এর কারণ হচ্ছে – মােবাইল ফোনের মাধ্যমে সবার সাথে দ্রুত যােগাযােগ করা যায় । স্বল্পসমূল্যেও মােবাইল ফোন ক্রয় করা যায় । মােবাইল ফোন আপনি যেখানেই যান না কোন সবসময় কাছে রাখা যায় । স্বল্প খরচে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে তথ্য আদান – প্রদান । করা যায় । মােবাইল ফোনের মাধ্যমে অডিও , ভিডিও গান , ওয়াজ শােনা যায় ।

স্মার্ট ফোনের অপব্যবহার / অসুবিধা / ক্ষতিকর প্রভাব :

ব্যাপকভাবে মােবাইল ফোনের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে বর্তমান প্রজন্ম । যার কারণে সারাদিন ফোন ব্যবহার করেও তারা ক্ষান্ত হয় না। রাতে কম্বলের নিচে মােবাইল ফোন ব্যবহার করে , সারারাত না ঘুমিয়ে মােবাইল ফোন ব্যবহার করে । সকালে ঘুম থেকে উঠেও আবার মােবাইল ফোনের খোঁজ করে । মােবাইল ফোন ছাড়া তারা এক মূহুত কল্পনা করতে পাওে না। নিম্মে বিস্তরতি আলােচনা করা হলাে :

রাস্তায় চলার সময় মােবাইল ফোন ব্যবহার করা :

এসময় রাস্তায় বের হলেই দেখতে পাওয়া যায় অনেকে হাঁটছে এবং তার সাথে মােবাইল ফোন ব্যবহার করছে । কারণ তিনি উপলব্ধিই করতে পারছেন না যে কোন সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে । ৫৩ % দুর্ঘটনা রাস্তায় হাঁটার সময় মােবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে সংঘটি হয় । যে কোন সময় কোন গাড়ি এসে আপনাকে আঘাত করতে পারে । রাস্তায় যে কোনকিছুর সাথে আঘাত লেগে পড়ে যেতে পারেন এবং তার সাথে আপনার মােবাইল ফোনটিও ভেঙ্গে যেতে পারে।রাস্তায় চলার সময় ফোনে কথা বলা , চ্যাট করা , গেমস খেলা বন্ধ করুন ।

দৃষ্টিশক্তি হ্রাসপায় মােবাইল ফোন ব্যবহারে :

রঙিন টেলিভিশন , মােবাইল ফোনগুলাে থেকে নীল আলােতে এক্সপােজার দৃষ্টির ক্ষতি করে । ফোনের আলাে কর্নিয়ার ক্ষতি করে । কর্নিয়া চোখের সামনের একটি স্পষ্ট রেন্স ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার চোখের চাপ , ব্যাথা অনুভব করতে পারেন । ইংল্যান্ডের চক্ষু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন , ফোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার দৃষ্টি বিকল্য সৃষ্টি করতে পারে । গবেষকরা বলেন , আপনার এপিজেনেটিকস সংক্রান্ত জিনগত সমস্যা দেখা দিতে পারে কারণ মােবাইল অনেক কম দূরত্বে রেখে ব্যবহার করা হয় । এজন্য মােবাইল ফোন কম ব্যবহার করা উচ্চিত ।

কানে শােনার সমস্যা :

উচ্চ শব্দে গান শােনা , অতিরিক্ত কথা গুলার কারণে অন্ত : কর্নের কোষগুলাের ওপর বিরুপ প্রভাব পড়ে যার কারণে মস্তিস্ক অস্বাভাবিক আচরন করে । এভাবে অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে আপনি বধির হয়ে যেতে পারেন ।

শুক্রানু সমস্যা দেখা দেয়ঃ

অতিরিক্ত মােবাইল ফোন ব্যবহার করলে গবেষকগন বলেছেন , মােবাইল ফোন থেকে নির্গত ক্ষতিকর তরঙ্গ শুক্রানুর ওপর প্রভাব ফেলে যার কারণে শুক্রানুর ঘনত্ব কমে যায় যা প্রভাব ফেলতে পারে সন্তান জন্মদানের ক্ষত্রে ।

গেমস খেলাঃ

তরুন প্রজন্ম পিসি , ল্যাপটপ , মােবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রচুর গেমস খেলে । যার ফলে প্রচুর সময় নষ্ট হয় । গেমসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ার কারণে অনেক সময় ধরে মােবাইল ফোন ব্যবহার করে । পড়াশােনার ক্ষতি হয় । মমাবাইল ফোন নিয়মিত পরিষ্কার না করা : যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকদের মতে , টয়লেটের সিটের তুলনায় মােবাইল ফোনে প্রায় ১০ গুন বেশি ব্যাকটেরিয়া থাকে । মােবাইল নিয়মিত পরিষ্কার না করার কারনে সেটা জীবাণুর বসবাসের আরও উপযােগী হয়ে ওঠে । এই জীবাণুগুলাে থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে।মােবাইল ফোনের ময়লা নিয়মিত পরিষ্কার করলে জীবাণু থেকে মুক্ত থাকা যায় ।

উপরােক্ত আলােচনা থেকে আপনারা সহজেই উপলব্ধি করতে পারবেন । মােবাইল ফোনের যেমন উপকারিতার দিক রয়েছে ঠিক তেমনি অপকারী । দিকও রয়েছে । সর্বদা চেষ্টা করুন অপকারী দিকগুলাে বিবেচনা করে মােবাইল ফোন ব্যবহার করতে । নিজের ছেলে – মেয়েদের মােবাইল ফোন থেকে দূওে রাখতে চেষ্টা করুন।মােবাইল ফোনের উপকারী দিকগুলাে থেকে অবশ্যই সেবা গ্রহন করুন । নিজেদের সন্তানরা যেন মােবাইল ফোনের প্রতি আসক্ত হয়ে না পরে সেইদিকে লক্ষ্য রাখুন । কারণ , তারাই আমাদের উন্নয়ণশীলদেশের কর্ণধার । পরিশেষে বলতে চাই , মােবাইল ফোনের যথাযথ ব্যবহারই হােক আমাদের অঙ্গীকার ।

Previous articleআন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ইতিহাস
Next articleএক নজরে জামালপুর জেলা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here