জানা-শেখায় আগ্রহ নেই, গাইড-সাজেশন পড়েই পাস করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

58

দেশে প্রতিবছর সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি, অনার্স, মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। তবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেন অনেকেই। চাকরির ক্ষেত্রেও তাদের গুরুত্ব দেওয়া হয় কম।

এর পেছনে অন্যতম কারণ মান সম্মত শিক্ষা। দেখা যায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালেয়ের শিক্ষার্থীরা সিলেবাসের পাঠ্য বই, কিংবা কোন ধরনের রেফারেন্স বই না পড়ে শুধুমাত্র বাজারের কিছু গাইড-সাজেশান পড়েই ডিগ্রি অর্জন করছেন। এমনকি অনেকেই ভালো রেজাল্টও করছেন। এর ফলে রেজাল্ট ভালো হলেও শিখন ঘাটতি থাকার কারণে সবক্ষেত্রে অবহেলিত হচ্ছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের পাঠ্য বই বা রেফারেন্স বই না পড়া কিংবা বইয়ের প্রতি অনাগ্রহের অনেকগুলো কারণ জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তারা মনে করেন নিয়মিত ক্লাস না হওয়া এবং দ্রুত পরীক্ষা নেওয়া এই দুটি হচ্ছে এর মূল কারণ।

এছাড়াও জানার আগ্রহের অভাব, প্রচারনা, বই কেনার সামর্থ্য না থাকা, ভালো ফলাফল অর্জনের আকাঙ্খা না থাকা ইত্যাদি কারণে শিক্ষার্থীরা বই পড়ে না। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজেরা মান সম্মত পাঠ্য বই প্রকাশ করে, কলেজগুলোতে বাজারভিত্তিক গাইড-সাজেশান বই নিষিদ্ধ করে শিক্ষার্থীদের পাঠ্য বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরী করার চেষ্টা করছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষা বর্ষের  মাস্টার্স পরীক্ষার্থী আওলাদ হোসেন জানান, আমি মাস্টার্সে কোন ক্লাস করিনি এবং কি বইও কিনিনি। পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে ৪৬০ টাকা দিয়ে একটি সাজেশান বই কিনেছি সেটা পড়েই পরীক্ষা দিয়েছি।

সেখান থেকে ৯৯% কমন আসে। আশা করি আমি ভালো রেজাল্ট করবো। কেবল আমি না প্রায় ৯০ শিক্ষার্থীই বই কিনেন না। পরীক্ষার আগে সাজেশান পড়ে পাশ করেন।২০২১ সালে অনার্স পাশ করা শাহীন জানান, আমি অনার্স ১ম বর্ষে বই কিনেছিলাম এর পর আর কোন বর্ষে বই কেনার প্রয়োজন হয়নি। শুধুমাত্র সাজেশান বই পড়েই ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছি।

কোন প্রশ্নের উত্তর নিয়ে সমস্যা হলে বিভাগের সেমিনার থেকে বই নিয়ে সমস্যা সমাধান করেছি। ২০১৮ সালে ডিগ্রি (বিএ) পাশ করা আরেক শিক্ষার্থী বলেন, আমি আসলে আমার সবগুলার বিষয়ের নামও জানি না। কারণ নিয়মিত বই পড়লে, ক্লাস করলেই তো পরে জানতে পারবো। জাতীয় ‍বিশ্ববিদ্যালয়ের যেই পদ্ধতি এই পদ্ধতিতে না পড়েও ভালো ফলাফল করা সম্ভব।

এজন্যই আমরা সাজেশন ছাড়া বই পড়ি। সাজেশনে প্রশ্নগুলোর উত্তর ছোট এবং সাজানো থাকে।এ বিষয়ে ফেনী সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মোতাহার হোসাইন বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষামুখী, ক্লাসমুখী নয়। খুব দ্রুত পরীক্ষার তারিখ দেয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা বই পড়ার সময় কম পায়। কারণ তারা মনে করে খুব অল্প সময়ে বই পড়ে পাশ করা সম্ভব না। দ্রুত সিলেবাস শেষ করার জন্য তাই সাজেশান পড়তে বাধ্য হয়।

এক্ষেত্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যদি ক্লাস এটন্ডেন্স, টিউটোরিয়াল নাম্বারের উপর সঠিকভাবে গুরুত্ব দেয় তাহলে এই সমস্যা সমাধান করা যাবে। চৌমুহনী সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহ আলম বলেন, কলেজগুলোতে ঠিকমত ক্লাস হয় না। এজন্য কোন বই থেকে কি পড়াচ্ছে তা জানার প্রয়োজন হয় না। বিভাগ থেকে বই কেনার জন্য কোনরকম নির্দেশনা বা চাপ দেয়া হয় না। বাজারে এক বিষয়ে অনেক রাইটারের বই থাকে। শিক্ষার্থীরা দ্বিধার মধ্যে থাকে কোন রাইটারের বই নেবে।

যদি বিভাগ থেকে কোন রাইটারের বই নেবে সেই ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়া হয় তাহলে শিক্ষার্থীরা বই নেবে। এছাড়াও বইয়ের কোন প্রচরনা করা হয় না। আগে একসময় দেখা যেত বইয়ের লেখকরা বিভিন্ন কলেজে গিয়ে বইয়ের প্রচারনা চালাতো। শিক্ষার্থীদের বই পড়ার জন্য উদ্ভুদ্ধ করতো। এখন সেটা করে না। তিনি আরও বলেন, প্রত্যক বছর বই কিনতে ৪-৫ হাজার টাকা খরচ হয়। অনেকরে সামর্থ্য নেই এত টাকা দিয়ে বই কেনার। তাই ইচ্ছা থাকলেও বই কিনতে পারে না।

আবার বিভাগের সেমিনারে পর্যাপ্ত পরিমাণে বই না থাকায় সেখান থেকে সংগ্রহ করেও বই পড়ার সুযোগ থাকে না। আবার বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর মাথায় ঘুরে কোনরকম পাস করলেই হলো। জানার বা শেখার আগ্রহ না নেই তাদের। তাই তারা বই পড়ে না।

এ সমস্যা সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত ক্লাসের সংখ্যা নির্ধারণ করে। নির্দিষ্ট সংখ্যক ক্লাস না হলে পরীক্ষা নেয়া যাবে না। তাহলে শিক্ষকরাও ক্লাস নেবে। অন্যদিকে ক্লাসে এটেন্ডেন্স নিশ্চিত করে তদারকি করলে শিক্ষার্থীরাও নিয়মিত ক্লাস করবে। তখন তাদের জানার আগ্রহ তৈরী হবে। বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকপূর্ব শিক্ষা বিষয়ক স্কুল-এর ডিন (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মো. নাসির উদ্দিন বলেন, এটি একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। কলেজের শিক্ষকদের মধ্য একটি বিশাল গ্রুপ বাজার ভিত্তিক গাইড বই-সাজেশন প্রকাশের সাথ জড়িত আছে।

আমরা এটি বন্ধের জন্য প্রত্যকটি কলেজে নোটিশ দিয়েছি। যেন সেসব গাইড বই, সাজেশান না পড়ানো হয়। যদি কোন শিক্ষক এইসব প্রকাশের সাথে জড়িত থাকে প্রমাণিত হলে আমরা তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

তিনি আরও বলেন, গত ৪ বছর আগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ‘টেক্টট বুক প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প চালু ‍করেন। এই প্রকল্পের আওতায় প্রত্যক বছর কমপক্ষে ৫০টি বই প্রকাশ করার পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়েছে।

এখন পর্যন্ত ১৪টি বই পাঠ্য বই প্রকাশিত হয়েছে। করোনা না হলে এতদিনে সেটি ১০০ ছাড়িয়ে যেতো। প্রত্যক বিষয়ের সংশ্লিষ্ট সেরা শিক্ষকরা এই বইগুলো লিখবে।

অধ্যাপক ড. মো. নাসির উদ্দিন বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এই বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং আইন করেছেন যে এই বিশ্ববিদ্যালিয়ের অধীনে যারা এমফিল, পিএইচডি করবেন তাদের সেসব থিসিস টেক্সট বই আকারে প্রকাশ করা হবে। সর্বোপরি আমরা চেস্টা করছি শিক্ষার মান উন্নয়ন করার জন্য। এটি অনেক সময় সাপেক্ষ  বিষয়। একটু সময়  লাগবে।

Previous articleবিশ্বের দীর্ঘতম
Next articleইমেইল মার্কেটিং কি এবং কিভাবে শুরু করবেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here