(সংকেত: ভূমিকা; বাংলাদেশের বিজয় দিবস; ঐতিহাসিক পটভূমি; ৭১ এর বিজয়োল্লাস; বাঙালির বিজয়োৎসব; বিজয় দিবসের তাৎপর্য; বিজয় দিবসের চেতনা; জাতীয় কর্তব্য; উপসংহার।)
ভূমিকা: বিজয় অর্থাৎ কোনো কিছুতে জয় লাভ করা। বর্হিশক্তির হাত থেকে মুক্ত হয়ে কোনো দেশের স্বাধীনতা লাভ করার দিনটিকে ঐ দেশের বিজয় দিবস বলা হয়। প্রতিটি জাতির জীবনেই বিজয় দিবস এক অনন্য গৌরবোজ্জ্বল দিন। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রতিবছর ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ বাঙালির জাতীয় জীবনে অপরিসীম আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে বিজয় দিবস। বিজয় দিবসের এই দিনটি বাঙালি জাতিসত্তার আত্মমর্যাদা, বীরত্ব এবং সার্বভৌমত্বের প্রতীক।
বাংলাদেশের বিজয় দিবস: ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর এই দিনে বাঙালি জাতি অর্জন করেছে পূর্ণাঙ্গ বিজয়। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাঙালিরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে তাদেরকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছিল। ৩০ লক্ষ শহিদের জীবন উৎসর্গ, অগণিত মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ৭১ এর এই দিনে পৃথিবীর মনচিত্রে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম হয়েছে বাংলাদেশের। তাই বিজয়ের এই দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনে সর্বাপেক্ষা স্মরণীয়, আনন্দময় এবং গৌরবের দিন।
ঐতিহাসিক পটভূমি: প্রায় দুই শত বছর শোষণের পর ১৯৪৭ সালে তীব্র আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশরা এ উপমহাদেশের দখলদারিত্ব ছাড়তে বাধ্য হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর হিন্দু ও মুসলমান এই দুই ধর্মের সংখ্যাগরিষ্ঠতার উপর ভিত্তি করে ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারত এই দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। মুসলমান অধ্যুষিত পাকিস্তান রাষ্ট্রটি মূলত দু’টি আলাদা ভূ-খন্ডে বিভক্ত ছিল। একটি অংশ হলো পশ্চিম পাকিস্তান এবং অন্যটি আমাদের বাংলাদেশ-তৎকালীন সময়ে যার নাম ছিল পূর্ব-পাকিস্তান। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দেশ হওয়া সত্ত্বেও শুরু থেকেই গোটা পাকিস্তান রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী। রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজকর্ম, অফিস, আদালত সবকিছু পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। মোটকথা, পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কোনো ক্ষেত্রেই স্বাধীনতা দেয়নি। ফলে সঙ্গত কারণেই পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙালির মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ থেকে মুক্তিলাভের ইচ্ছা জাগে। ১৯৫২ সালে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চাইলে বাঙালির মনে স্বাধীনতার গোপন ইচ্ছা তীব্রতর রূপ লাভ করে। মূলত ৫২-র এই ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের সূত্রপাত ঘটেছিল। ৬২ এর শিক্ষা-আন্দোলন, ৬৬ এর ছয় দফা এবং ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত মজবুত হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করে বাঙালিরা তাদের আকাক্সক্ষার রূপদানের স্বপ্ন দেখলেও পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের শোষণের কারণে তা অবাস্তবই থেকে যায়। পশ্চিম পাকিস্তানি সরকার নির্বাচিত সরকারের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা না দিয়ে বরং দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়। এরই প্রতিবাদে বাঙালির জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ ১৯৭১ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বাঙালির আপামর জনসাধারণের উদ্দেশ্যে স্বাধীনতার ডাক দেন। ২৫ মার্চ রাতেই মেজর জেনারেল টিক্কা খানের নির্দেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাজধানীর ঘুমন্ত নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের উপর হামলা চালায়। বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকা, রাজারবাগ পুলিশ লাইন প্রভৃতি স্থানে পাক সেনারা নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়। এরপর ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক, শিল্পী-সাহিত্যিক, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এদেশের সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। অবশেষে ৭১ এর ১৬ ডিসেম্বরে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যার জন্য আপামর জনসাধারণ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করেছিল। ঐদিন রেসকোর্স ময়দানে পাকসেনারা মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এবং সূচনা ঘটে বাংলাদেশের মহান বিজয়, জন্ম হয় একটি স্বাধীন দেশের, যার নাম বাংলাদেশ।
৭১ এর বিজয়োল্লাস: ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দিনটি ছিল বাঙালির বহু ত্যাগ-তিতীক্ষা ও সাধনার ফল। ৭ কোটি বাঙালির মহা উৎসবের দিন ছিল সেটি। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের দুঃসহ স্মৃতি, স্বজন-হারানোর বেদনা সবকিছু ভুলে মনুষ দলে দলে নেমে এসেছিল রাজপথে। সবার হাতে ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা।দুর্বিষহ অতীতকে ভুলে মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল সম্ভাবনাময় আগামীর বাংলাদেশের। বাঙালির জাতীয় জীবনে এর থেকে আনন্দের দিন আর নেই।
বাঙালির বিজয়োৎসব: ১৫ ডিসেম্বর রাত ১২.০১ মিনিট থেকে বাঙালির বিজয়োৎসব শুরু হয়। ১৬ ডিসেম্বর ভোরে স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গকারী লাখো শহিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সর্বস্তরের জনগণ সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধে মিলিত হয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। এ দিনে সরকারি ছুটি পালিত হয়। এদিন জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে বাংলাদেশের সকল সামরিক ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর অংশগ্রহণে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ অসংখ্য মানুষ এ অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। বিজয় দিবসের এ দিনে সারাদেশের সমস্ত স্কুল-কলেজ, ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট ও যানবাহনের লাল-সবুজ পতাকা দেখা যায়। দিনব্যাপী টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। সারাদেশের সকল মসজিদ-মন্দির-গীর্জা-প্যাগোডায় মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও প্রার্থনা করা হয়। মোটকথা, দেশের প্রতি জেলায়, প্রতি ঘরে ঘরে বিজয়ের এ দিনটি আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালন করা হয়।
বিজয় দিবসের তাৎপর্য: স্বাধীনতা যুদ্ধে গৌরবময় বিজয় অর্জনের মাধ্যমে বাঙালি জাতি বিশ্বের দরবারে স্বতন্ত্র পরিচয় লাভ করেছে। বাঙালির জাতীয় জীবনে বিজয় দিবসের তাৎপর্য অনস্বীকার্য। প্রতি বছর বিজয় দিবস উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্ম মক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বাঙালির আত্মত্যাগের মহিমা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। এরই ফলশ্রুতিতে তারা স্বাধীনতা সংগ্রাম, বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভাষা -সংস্কৃতি প্রভৃতি নিয়ে গবেষণাধর্মী কাজ করতে আগ্রহী হচ্ছে, যা বিশ্বের কাছে জাতি হিসেবে বাঙালির মান-মর্যাদা আরো বাড়িয়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
বিজয় দিবসের চেতনা:
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য যথার্থই বলেছেন –
‘সাবাস বাংলাদেশ! এ পৃথিবী-
অবাক তাকিয়ে রয়
জ্বলে-পুড়ে-মরে ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়।’
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির এক চেতনার নাম। আর বিজয় দিবস সেই চেতনাকে ছড়িয়ে দিয়েছে কোটি বাঙালির প্রাণে। ’৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রাম আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে অন্যায়, অবিচার, শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে হয়। প্রতি বছর বিজয় দিবস আমাদের মনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রেরণা দিয়ে যায়। তরুণ প্রজন্মের উচিত লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বিজয়ের চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে দেশবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
জাতীয় কর্তব্য: বাঙালি হিসেবে প্রত্যেকেরই এ দিনটির প্রতি কিছু কর্তব্য রয়েছে। কেবল বিজয় দিবসের একটি দিনেই নয়, বরং বিজয়ের চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে প্রত্যেক বাঙালির উচিত সারা বছরই দেশ-জাতি, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের পক্ষে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে কাজ করে যাওয়া। বিজয় দিবসের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ ও প্রচারে জাতীয়ভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যারা স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বিজয়ের ইতিহাস বিকৃত করে পরবর্তী প্রজন্মকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে সচেষ্ট তাদেরকে চিহ্নিত করে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া বাঙালির জাতীয় কর্তব্য।
উপসংহার: বিজয় দিবস বাঙালির জীবনে একই সাথে আনন্দের দিন, আবার বেদনারও দিন। প্রতি বছর এ দিবসটি আমাদের মাঝে ঘুরে ফিরে এসে স্বাধীনতা সংগ্রামে জীবন উৎসর্গকারী লাখো শহিদের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে যায়। প্রিয় মাতৃভূমির মর্যাদা রক্ষায় মহান ইতিহাসের স্মরণে ’৭১ থেকে এ পর্যন্ত বিজয় দিবস অত্যন্ত জাকজমকপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশে পালিত হয়ে আসছে।
Rate this post

By Mithu Khan

I am a blogger and educator with a passion for sharing knowledge and insights with others. I am currently studying for my honors degree in mathematics at Govt. Edward College, Pabna.