বায়োমেডিকেল বর্জ্য কয় প্রকার ও কী কী?

বায়োমেডিকেল বর্জ্যকে কয়েকটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। যেমন –

শ্রেণি-১ঃ মানবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।

শ্রেণি-২ঃ প্রাণজাত বর্জ্য যেমন প্রাণীর যেমন প্রাণীর মৃতদেহ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, রক্ত ইত্যাদি।

শ্রেণি-৩ঃ মাইক্রোবায়োলজি ও বায়োটেকনোলজি ল্যাবরেটরিজাত বর্জ্য।

শ্রেণি-৪ঃ তীক্ষ্ম, ধারাল বর্জ্য যেমন – সূচ, সিরিঞ্জ, ছুরি, ব্লেড, কাচ ইত্যাদি।

শ্রেণি-৫ঃ পরিত্যাক্ত ওষুধ।

শ্রেণি-৬ঃ রক্ত মাখা কঠিন বর্জ্য যেমন – গজ, তুলো, প্লাস্টারের কাটা অংশ ইত্যাদি।

শ্রেণি-৭ঃ চিকিৎসা সংক্রান্ত অন্যান্য কঠিন বর্জ্য যেমন – ক্যাথেটর, টিউব ইত্যাদি।

শ্রেণি-৮ঃ রাসায়নিক বর্জ্য পদার্থ যেমন – অ্যাসিড, ফরমালিন ইত্যাদি।

বায়োমেডিকেল বর্জ্যের বিশেষত্ব

বায়োমেডিকেল বর্জ্য অন্যান্য সকল প্রকার সাধারণ বর্জ্য, নোংরা, বিঘ্ন-বিপত্তি সৃষ্টিকারী বর্জ্য যেমন – রাসায়নিক তেজস্ক্রিয়, কৃষিক্ষেত্রের বর্জ্য ইত্যাদি যা শিল্পবর্জ্য নামে পরিচিত, এদের তুলনায় স্বতন্ত্র। চিকিৎসা পরিষেবা থেকেও রাসায়নিক এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্য উৎপন্ন হয়। তবে এই সকল রাসায়নিক ও তেজষ্ক্রিয় বস্তু সাধারণত বিঘ্ন সৃষ্টি করে না। তবে এদের সঠিক স্থানে এবং সঠিক পদ্ধতিতে গর্ত খুঁড়ে মাটি চাপা করতে হয়। তবে ফরমালিন নামক তরল রাসায়নিক সংরক্ষিত হাসপাতালের যেকোনো জৈব উপাদান নানাবিধ বিঘ্ন-বিপত্তি সৃষ্টি করতে সক্ষম।

বায়োমেডিকেল বর্জ্য থেকে মানুষের স্বাস্থ্যহানির সম্ভাবনা

বায়োমেডিকেল বর্জ্য সর্বদাই পরিবেশের বিঘ্ন সৃষ্টি করে থাকে। অনেক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যকে সংক্রমণ সৃষ্টিকারী বা বায়োহ্যাজার্ড সৃষ্টিকারী বলে চিহ্নিত করা হয়, কারণ এই সকল বস্তু থেকে রোগ সংক্রমিত হতে পারে। মানুষের সংক্রমণ থেকে অনেক ক্ষেত্রে কোনো কোনো অঞ্চলের অনেক জীবিত প্রাণীর দেহেও রোগে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

বায়োমেডিকেল বর্জ্য অপসারণ সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা

বায়োমেডিকেল বর্জ্য অপসারণ একটি বিশেষ প্রকার বর্জ্য মোচন পদ্ধতি। এই কাজের সময় সর্বদা লক্ষ রাখতে হয় যাতে বর্জ্য থেকে পরিবেশ দূষণ না ঘটে। বায়োমেডিকেল জঞ্জাল অপসারণের উদ্দেশ্য হলো সাধারণ নাগরিক, স্বাস্থ্যকর্মী, বিশেষতঃ স্বাস্থ্য পরিসেবার সঙ্গে জড়িত সকল মানুষ, ডাক্তার, নার্স, আয়া, পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে যুক্ত কর্মী যেমন- ঝাড়ুদার, মেথর, খাদ্য পরিবেশক, রোগীর খাদ্যের অবশিষ্টাংশ পরিস্কার করার লোক, রোগীর মল-মূত্র, থুথু, পুঁজ-রক্ত, দেহ তরল পরিস্কার করার লোক প্রভৃতি সকলেই যাতে নিরাপদে থাকতে পারে। এইসব বিষয় বিবেচনা করেই বায়োমেডিকেল বর্জ্য অপসরণ ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হয়। এই ব্যবস্থাপনার মধ্যে আছে –

১) যে সকল উৎস থেকে এই প্রকার বর্জ্য উৎপন্ন হয় সেগুলি চিহ্নিতকরণ এবং সেখান থেকে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে সেইসব বর্জ্য সংগ্রহ করা।

২) বর্জ্য বস্তু যাতে চারিদিকে ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য বস্তুগুলি নির্দিষ্ট স্থানে একত্রিত করা।

৩) সংগ্রহ এবং সঞ্চয় প্রভৃতি কাজে অংশগ্রহণকারী কর্মীরা যাতে সব কাজ স্বাস্থ্যসম্মত এবং বিধিসম্মত উপায়ে করতে পারে সে বিষয়টি গুরুত্বদিয়ে দেখা। এই ব্যবস্থাপনার এই ধাপকে বলা হয় হ্যান্ডলিং বা সামগ্রিক পরিচালনা।

৪) ব্যবস্থাপনার পরবর্তী ধাপকে বলা হয় জড়ো করা বা স্টোরেজ।

৫) জমানো বর্জ্য তার পরের ধাপে শোধন করা হয়।

৬) শোধনের পরে নির্দিষ্ট বাহনে করে বর্জ্য মোচনের স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং

৭) বিধিসম্মত পদ্ধতিতে শোধিত বর্জ্যের সমাপ্তি ঘটানো হয়।

বায়োমেডিকেল বর্জ্য অপসারণের নিয়মকানুন

ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বায়োমেডিকেল বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট নিয়মকানুন আছে। ভারতে 1998 খ্রিস্টাব্দে বায়োমেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা আইন চালু হয়েছে। পরে এই আইনের সংশোধনী আনা হয়েছে। 28 মার্চ 2016 খ্রিস্টাব্দে বায়োমেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আইন কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক প্রচলিত হয়েছে। প্রতিটি রাজ্যের প্রদূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ অথবা প্রদূষণ কমিটি কেন্দ্রীয় সরকারের এই আইন প্রয়োগের জন্য দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়েছে।

আইন থাকা সত্ত্বেও ভারতের অধিকাংশ হাসপাতাল, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য পরিষেবা কেন্দ্রের নিকাশি ব্যবস্থা অত্যন্ত হতাশজনক এবং পরিবেশ জনস্বাস্থ্য এবং জীবজগতের জীবন বিপদজনক অবস্থায় আছে।

কিছু কিছু সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রতিষ্ঠান ISO, NABH, JCI প্রভৃতির স্বীকৃতি পাবার জন্য নিজস্ব উদ্যোগে আইনানুগ বর্জ্য অপসারণের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ডাক্তার, নার্সসহ স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত সকল ব্যক্তিকে বায়োমেডিকেল বর্জ্যের কুফলতা নিয়ে প্রশিক্ষিত করবার প্রচেষ্টা চলছে।

সম্প্রতি বিভিন্ন প্রকার বর্জ্য পৃথকভাবে রাখবার জন্য বিভিন্ন বর্ণ সংকেত ব্যবহারের নির্দেশিকা চালু হয়েছে। যেমন –

১) লালবর্ণের ব্যাগঃ সূঁচবিহীন সিরিঞ্জ, ব্যবহৃত গ্লাভস্, ক্যাথেটার, ইন্ট্রাভেনাস টিউব প্রভৃতি লালবর্ণের ব্যাগে রাখতে হবে এবং ব্যাগসহ সমগ্র বর্জ্য ইনসিনেরেটরে দহন করত হবে।

২) হলুদ বর্ণের ব্যাগঃ সকল প্রকার ড্রেসিং ব্যান্ডেজ, দেহ তরলযুক্ত কাপড়ের সোয়াব, রক্তের ব্যাগ, মানুষের দেহের পরিত্যক্ত অংশ বা ব্যবচ্ছেদ অঙ্গ প্রভৃতি হলুদবর্ণের ব্যাগে রাখতে হবে।

৩) নীল বর্ণাঙ্কিত কার্ডবোর্ডের বাক্সঃ এতে রাখা হবে কাচের ভায়াল, অ্যামপ্যুল, কাচের অন্যান্য বর্জ্য।

৪) ছিদ্রহীন সাদা পাত্রঃ এতে রাখা হবে সূঁচ, স্ক্যালপেল জাতীয় ধারালো বস্তু, ব্লেড প্রভৃতি।

৫) কালো ব্যাগঃ এই ব্যাগে রাখতে হবে বায়োমেডিকেল বর্জ্য নয় এমন বস্তু। একটি হাসপাতাল বা সমকাজের প্রতিষ্ঠানে এই বর্জ্য বস্তুর মধ্যে থাকে স্টেশনারি বস্তু, সব্জি এবং ফলের খোসা, খাদ্যের পরিত্যক্ত অংশ, ঔষধের প্যাকেট ডিসপোসেবল ক্যাপ, ডিসপোসেবল জুতোর ঢাকনি, ডিসপোসেবল চায়ের কাপ, কার্টুন, ঝাড়ু দেবার পর জমা ধুলো, রান্নাঘরের বর্জ্য প্রভৃতি।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x