বিজ্ঞান কী? এটা কিভাবে এবং কেন কাজ করে? –

যদি সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য নিজের সুবিধামত কিছু বিজ্ঞানভিত্তিক সত্য বেছে নেন, তাহলে আপনি শিক্ষিত এবং তথ্যভিত্তিক গণতন্ত্রের (informed democracy) ভিত্তিটাকেই অবজ্ঞা করছেন।

প্রকৃতির নিয়মকে বোঝার, যাচাই এবং অনুমান করার, আর নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলেও এই বিশ্বের ঘটনা এবং সেগুলোর ফলাফল সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করার শক্তি দেয়ার মাধ্যমে বিজ্ঞান নিজেকে মানুষের অন্য সকল অন্বেষণ থেকে আলাদা করে নেয়। বিজ্ঞান আমাদের স্বাস্থ্য, সম্পদ, এবং নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে। আর নিরাপত্তার ব্যাপারটা নিয়ে বলতে গেলে – এখন মানবপ্রজাতি যতটা নিরাপত্তা উপভোগ করছে, ইতিহাসের আর কোনো অধ্যায়েই ততটা করেনি। যে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রক্রিয়াটা এই সকল সাফল্যের পেছনে অবদান রেখেছে, তা একটা বাক্যেই বলে দেয়া যায়। আর সেই বাক্যটা নিরপেক্ষতার সাথে সম্পর্কিত – মিথ্যাকে সত্য ভেবে আর সত্যকে মিথ্যা ভেবে বোকা হওয়ার হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য যা যা করা দরকার, সেটাই করো।

জানার এই প্রক্রিয়াটা সপ্তদশ শতাব্দীর আগে ঠিক শেকড় গেড়ে বসতে পারেনি। তখনই অণুবীক্ষণ আর দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কার হয়েছিলো। জ্যোতির্বিদ গ্যালেলিও আর দার্শনিক স্যার ফ্রান্সিস বেকন দুজনেই একটা ব্যাপারে একমত হয়েছিলেন – নিজের প্রস্তাবনাগুলোকে যাচাই করার জন্য নিরীক্ষাধর্মী গবেষণা করা, এবং প্রমাণের মাত্রার ভিত্তিতে সমর্থনের মাত্রা বাড়ানো (যত বেশি প্রমাণ, তত বেশি সমর্থন)। এরপরে আমাদেরকে যেটা বুঝতে হবে, তা হলো – নতুন আবিষ্কৃত বা প্রচারিত কোনো তথ্যকে ততক্ষণ সমর্থন দেয়া যাবে না, যতক্ষণ না একাধিক গবেষক (এবং একসময় প্রায় সকল গবেষক)  আলাদা আলাদা গবেষণা করে একইরকম/সংগতিপূর্ণ ফলাফল পাচ্ছেন।

এই নিয়মগুলো মেনে চলার গুরুত্ব অনেক বেশি। ভুল বা একপেশে (অনিরপেক্ষ) ফলাফল ছাপানোর বিরুদ্ধে কোনো আইন নেই। কিন্তু এমনটা করলে আপনাকে যে মাশুলটা দিতে হবে, তা বেশ চড়া। যদি সহকর্মীরা আপনার গবেষণা যাচাই করে এবং দেখে যে কেউই আপনার বের করা ফলাফলটা পাচ্ছে না, তাহলে ভবিষ্যৎ গবেষণাগুলোতে আপনার সততাকে বারবার কাঠগড়ায় তোলা হবে। যদি কঠিন রকমের প্রতারণা করে থাকেন, যেমন ধরুন – ইচ্ছে করে ভুল উপাত্ত (ডেটা) বানিয়ে থাকেন – এবং পরবর্তীতে গবেষকরা এটা বুঝতে পারেন, তাহলে আপনার ক্যারিয়ার সেখানেই শেষ। সাফ কথা!

বিজ্ঞানের এই সহজাত, আত্মশুদ্ধিমূলক ব্যবস্থাটা হয়তো অন্যান্য সকল পেশার চেয়ে আলাদা। আর এই ব্যবস্থাটার জন্য জনগণ, সংবাদ সংস্থা, বা রাজনীতিবিদ, কারোই প্রয়োজন পড়ে না। তবুও এই প্রক্রিয়াটার সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবে। শুধু একটাবার বিজ্ঞানভিত্তিক পত্রিকাগুলোর পাতায় সমকক্ষ গবেষকদের দ্বারা যাচাইকৃত প্রবন্ধগুলো দেখুন! আবিষ্কারের এই আঁতুড়ঘর কিন্তু কখনো কখনো লড়াইয়ের আখড়াতেও পরিণত হয়; আর লড়াইটা হয় বিজ্ঞানভিত্তিক বিতর্কগুলো নিয়ে।

বিজ্ঞান নিরপেক্ষ সত্যকে উদঘাটিত করে। উঁচু এক আসনে বসে থাকা কোনো কর্তৃপক্ষ সেই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে না, একক কোনো গবেষণা প্রবন্ধও সেটা করতে পারে না। সংবাদ সংস্থাগুলো তো সবসময়ই মুখরোচক খবর প্রকাশ করতে চায়। আর সেই উদ্দেশ্যে নতুন প্রকাশিত যে কোনো প্রবন্ধকে একদম শিরোনামের মধ্যেই “সত্য” বলে চালিয়ে দেয়। হয়তো সেই খবরের মধ্যে গবেষক/লেখকদের শিক্ষাগত যোগ্যতার ঠিকুজি লিখে দেন, সেগুলোর প্রশংসা করেন। কিন্তু আসলে তো সত্য তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পরবর্তী গবেষণাগুলো সেই ফলাফলকে সমর্থন করতেও পারে, প্রত্যাখ্যানও করতে পারে, আবার একই সাথে দুরকম ফলাফলও আসতে পারে। তার মানে, ঐ গবেষণাটা দিয়ে আসলে কিছুই বোঝা যায় না।

একবার যখন এই পদ্ধতিগুলোর মধ্যে দিয়ে কোনো নিরপেক্ষ সত্য বেরিয়ে আসে, সেগুলো আর মিথ্যে প্রমাণিত হবার সুযোগ থাকে না। পৃথিবী কি গোল? সূর্য কি গরম? মানুষ আর শিম্পাঞ্জীর মধ্যে কি ৯৮% ডিএনএ মিল আছে? বায়ুমণ্ডলের ৭৮ ভাগ কি নাইট্রোজেন? আমরা এই প্রশ্নগুলো নিয়ে আর মাথা ঘামাই না।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কোয়ান্টাম আর আপেক্ষিকতা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের যে যুগ শুরু হয়েছে, সেটা কিন্তু নিউটনের গতি আর মহাকর্ষের সূত্রকে নাকচ

করে দেয়নি। যা করেছে, তা হলো – আরো উপযুক্ত উপায়ে, অনুসন্ধানের নতুন হাতিয়ার ব্যবহার করে প্রকৃতির আরো গভীর বাস্তবতাকে উদঘাটন করেছে। চিরায়ত/সনাতন (Classical) পদার্থবিদ্যা এখন আধুনিক পদার্থবিদ্যার একটা শাখা হিসেবে আছে যেটা সত্যের একটা বিশেষ অংশ নিয়ে কাজ করে।

গবেষণার জগতে সর্বসম্মতি জিনিসটা আসার আগে যা যা বলা হয়েছিলো, সেগুলোকে নিরপেক্ষ সত্য হিসেবে বিজ্ঞান দাবি করতে পারে না। সপ্তদশ শতাব্দীর আগে, যখন আমাদের অপর্যাপ্ত আর পক্ষপাতদুষ্ট ইন্দ্রিয়গুলো ছাড়া সত্যের যাচাইয়ের জন্য আর কোনো হাতিয়ার ছিলো না, তখনকার ব্যাপারে নিরপেক্ষ সত্যের আশ্বাস দেয়া যায় না। বাস্তবতাকে আপনি যেভাবেই দেখেন না কেন, নিরপেক্ষ সত্যের অবস্থান তার উর্ধ্বে। যেমন – পাইয়ের মান, E=mc^2, পৃথিবীর আবর্তনের হার, কার্বন ডাইঅক্সাইড এবং মিথেন যে গ্রীনহাউজ গ্যাস – এগুলো স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে প্রমাণ করা সম্ভব। আর আপনি বিশ্বাস করেন আর নাই করেন, এগুলো সত্য।

আর অন্যদিকে, ব্যক্তিগত সত্যগুলো আপনার নিজের কাছে খুব আপন হলেও ভিন্নমতাবলম্বীদেরকে সেটা মানতে রাজি করানোর কোনো উপায় নেই (তুমুল বাকবিতণ্ডা আর জোর করে চাপিয়ে দেয়া ছাড়া)। অথচ এগুলোই বেশির ভাগ মানুষের মতামতের উৎস! যীশু কি আপনার ত্রাণকর্তা? মুহাম্মাদ কি আল্লাহর পাঠানো শেষ রাসূল? সরকারের কি দরিদ্রদেরকে সাহায্য করা উচিৎ? বিয়ন্সে কি (এ যুগের) সাংস্কৃতিক রাণী? (স্টার ট্রেকের চরিত্রের মধ্যে) কার্ক নাকি পিকার্ড? মতামতের পার্থক্য থেকে একটা জাতির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সন্ধান পাওয়া যায়, আর এই পার্থক্যটাকে যে কোনো স্বাধীন সমাজে রক্ষা করা উচিৎ। আপনাকে সমকামী বিয়ে পছন্দ করতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। আপনাকে কেউ জোর করে সমকামী বিয়ে করতে বলছে না। কিন্তু আইন বানিয়ে অন্যদেরকে সেটা করতে বাধা দেয়ার মানে হচ্ছে – আপনি নিজের ব্যক্তিগত সত্য অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। এক অর্থে, আপনার ব্যক্তিগত মতামতকে রাজনৈতিকভাবে অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেয়াই কিন্তু স্বৈরাচার।

বিজ্ঞানের জগতে আরেকটা জিনিস মনে রাখা দরকার; সেটা হচ্ছে – সায় দিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা এখানে সফলতার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। আমাদের ওপরে প্রায়ই একটা অভিযোগ করা হয় যে আমরা নাকি একজন আরেকজনের পিঠ চুলকে যাচ্ছি; শুধু নাকি সায় দিয়ে যাচ্ছি একে অপরকে। আমরা যারা বিজ্ঞানের জগতে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে চাইছি, তারা এই অভিযোগ শুনি আর হাসি। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের এই জগতে নিজের জীবদ্দশায় বিখ্যাত হবার সবচেয়ে মোক্ষম উপায়টা হচ্ছে – আগের কোনো গবেষণার বিরোধিতা করে এমন একটা প্রস্তাব উত্থাপন করা, যা শেষ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ আর নিরীক্ষার মাধ্যমে বারংবার প্রমাণিত হবে। এই পদ্ধতিটা সুস্থ বিতর্কের পথ নিশ্চিত করে, এবং নতুন কিছু আবিষ্কারের দুর্গম পথে চলতে সাহায্য করে।

১৮৬৩ সালে, প্রথম রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের কাঁধে নিশ্চয়ই আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিলো (তখন আমেরিকাতে গৃহযুদ্ধ চলছিলো)। সেই বছরেই তিনি কংগ্রেসের একটা আইনের ওপর ভিত্তি করে ন্যাশনাল একাডেমি অফ সায়েন্সেস প্রতিষ্ঠা করলেন। এই মহান সংস্থাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যাপারে জাতিকে স্বাধীন, স্বতন্ত্র, নিরপেক্ষ উপদেশ দেবে – এই প্রত্যাশায় তিনি একাডেমি প্রতিষ্ঠার কাগজে সই করলেন।

আজ, বিজ্ঞানের উদ্দেশ্যে নিবেদিত অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো একই দায়িত্ব পালন করছে। যেমন – NASA করছে মহাকাশ আর মহাশূন্য ভ্রমণ নিয়ে; NIST করছে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিমাপের মানদণ্ড নিয়ে, এটার ওপরেই অন্য সকল পরিমাপ নির্ভর করে কিন্তু; DOE করছে কাজে লাগানোর মত সব রকম শক্তির উৎস নিয়ে; আর NOAA করছে পৃথিবীর আবহাওয়া আর জলবায়ু নিয়ে।

অন্যান্য নির্ভরযোগ্য বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোসহ, এই কেন্দ্রগুলো আমাদের রাজনীতিবিদদেরকে একটা জ্ঞানসমৃদ্ধ এবং তথ্যভিত্তিক সরকার ব্যবস্থা গঠন করতে সহায়তা করবে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x