দ্বিতীয় আকাবায় ৭৩ জন সাহাবী নবিজীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে বাইয়াত নিতে আসেন। তারমধ্যে মাত্র দুইজন ছিলেন নারী। দুজন নারী সাহাবীর মধ্যে একজনের নাম হলো- নুসাইবা বিনতে কা’ব (রাদিয়াল্লাহু আনহা)। তাঁর ডাকনাম হলো- ‘উম্মু উমারা’। আনসারী সাহাবীদের মধ্যে যেসব নারী প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণ করেন, উম্মু উমারা (রা:) ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর স্বামী গাযিয়্যা ইবনে আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এবং দুই পুত্র আব্দুল্লাহ ও হাবিব (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) ইসলাম গ্রহণ করেন।
উহুদ যুদ্ধে উম্মু উমারার (রা:) পুরো পরিবার অংশগ্রহণ করে। উম্মু উমারার (রা:) দায়িত্ব ছিলো যুদ্ধরত সাহাবীদের পানি পান করানো।

উহুদ যুদ্ধে নবিজীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশ অমান্য করায় এক পর্যায়ে বিপর্যয় দেখা দেয়। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (তখন অমুসলিম ছিলেন), পাল্টা আক্রমণ করেন। সবাই হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। সাহাবীরা যুদ্ধের ময়দান থেকে পালাতে থাকেন। অন্যদিকে নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনেকটা একা হয়ে পড়েন। কুরাইশ বাহিনী তাঁকে পেয়েই গিয়েছিলো। চারিদিকে গুজব রটে যায় যে, নবিজীকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শহীদ করা হয়েছে!

নবিজীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আহ্বানে কয়েকজন সাহাবী তাঁকে দেখতে পান, তাঁকে প্রতিরক্ষা করতে গিয়ে মানবদেয়াল হয়ে যান।
নবিজীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবনের অন্যতম কঠিন মুহূর্তে তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে যান উম্মু উমারা (রা:) ও তাঁর পরিবার।
উম্মু উমারা (রা:) ঢাল দিয়ে তাঁর দিকে আসা তরবারির আঘাত ফিরিয়ে দেন। একজন অশ্বারোহীকে তিনি ঘোড়ায় আঘাত করে মাটিতে ফেলে দেন এবং তিনি ও তাঁর ছেলে মিলে তাঁকে হত্যা করেন।

নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেদিকেই তাকান, দেখতে পান উম্মু উমারা (রা:) তাঁর প্রতিরক্ষার জন্য এদিক-ওদিক ছুটছেন, শত্রুদের তরবারির আঘাত ফিরিয়ে দিচ্ছেন, শত্রুদেরকে ঘায়েল করছেন। উম্মু উমারা (রা:) কাঁধে আঘাত লাগে। রক্ত যেনো বন্ধই হচ্ছিলো না।
নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরামর্শ দেন ব্যান্ডেজ লাগানোর। তখন তিনি উম্মু উমারার (রা:) পুরো পরিবারের জন্য দু’আ করেন:
“হে আল্লাহ! তাদের সবাইকে জান্নাতে আমার প্রতিবেশী বানিয়ে দাও।”

যোদ্ধা নারী

উহুদ যুদ্ধে নবিজীকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতিরক্ষা করতে গিয়ে উম্মু উমারার (রা:) শরীরে ১২ টি আঘাত লাগে।
কাঁধের আঘাতটি ভালো হতে প্রায় এক বছর সময় লাগে।
উম্মু উমারা (রা:) পরিচিত হোন ‘যোদ্ধা নারী’ হিশেবে। উহুদ, হুদাইবিয়া, খায়বার ও ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন।
মুসায়লামা আল-কাজ্জাব নবুওয়াত দাবি করে। একবার সে উম্মু উমারার (রা:) ছেলে হাবিবকে (রা:) গ্রেফতার করে।
সে তাঁর কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায় করতে চাচ্ছিলো যে, সে একজন নবী। কিন্তু, হাবিব (রা:) তাঁর কথা মানতে রাজি হোননি।
মুসায়লামা যতোইই বলছিলো তার কথা মানতে, হাবিব ততোই অস্বীকার করে যাচ্ছিলেন।

আপাতত বিপদের সময় মুখে অস্বীকার করে অন্তরে বিশ্বাস থাকলে সেটা ইসলাম সমর্থন করে। কিন্তু, হাবিব (রা:) নিজের জীবন হুমকির মুখে জেনেও সত্য স্বীকারে কনসিসট্যান্ট থাকেন। তিনি মুসায়ালামার নবুওয়াত অস্বীকার করেই যান। যার ফলে, মুসায়লামা তাঁকে শহীদ করে।
উম্মু উমারা (রা:) যখন শুনতে পান যে, মুসায়লামা তাঁর আদরের মানিক হাবিবকে (রা:) শহীদ করেছে, তখন তিনি বলেন:
“সত্য স্বীকার করে বীরের মতো শহীদ হবার জন্যই আমি তাঁকে গড়ে তুলেছিলাম।”

ছেলের শাহাদাতে উম্মু উমারা (রা:) আফসোস না করে বরং গর্ব করেন। মুসায়লামার বিরুদ্ধে মুসলিমরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলো।
ইতিহাসে সেই যুদ্ধ ‘ইয়ামামার যুদ্ধ’ নামে উম্মু উমারা (রা:) যুদ্ধে যান মুসায়লামাকে হত্যা করতে।
এক হাতে তরবারি আর অন্য হাতে বর্শা নিয়ে তিনি এগিয়ে যান মুসায়লামার দিকে। যাত্রাপথে শত্রুদেরকে তরবারির আঘাতে ছিন্ন করতে থাকেন।
তাঁর শরীরের ১১ টি আঘাত লাগে, এমনকি তাঁর বাহু থেকে একটি হাত প্রায় বিচ্ছিন্নও হয়ে যায়। তবুও তিনি তাঁর সংকল্পে অটল।
কিন্তু, যেই না তিনি মুসায়লামাকে আঘাত করবেন, তখন দেখতে পান ইতোমধ্যে মুসায়ালামাকে আঘাত করা হয়ে গেছে।
সে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। দুজন ব্যক্তি মুসায়লামাকে আঘাত করে। তারমধ্যে একজন হলেন তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ।

মুসলিম বাহিনীর কম্যান্ডার

মুসলিম বাহিনীর কম্যান্ডার খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) উম্মু উমারার (রা:) বিরত্বের প্রশংসা করেন। খলিফা উমরও (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁকে সম্মান করতেন। একবার তাঁর কাছে গণিমতের সম্পদ হিশেবে মূল্যবান একটি চাদর আসে। সবাই ভেবেছিলেন চাদরটি হয়তো তিনি তাঁর স্ত্রী অথবা পুত্রবধূকে দিবেন। কিন্তু, সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি চাদরটি দেন উম্মু উমারাকে (রা:)।

আরিফুল ইসলাম
২৩ জুন ২০২১

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x