যে বিজ্ঞানের সাহায্যে বস্তু বা পদার্থের গঠন, প্রস্তুত প্রণালী, ধর্মাবলী, ব্যবহার তাপীয় ও বৈদ্যুতিক পরিবর্তন প্রভৃতি সুস্পষ্ট বিধিযোগে সুষ্ঠুরুপে পর্যালোচনা করা যায় তাকেই রসায়ন বিজ্ঞান বলে।

রসায়নের শাখা সমূহ

রসায়ন বিজ্ঞানের পরিধি ব্যাপক ও বিস্তৃত। কাজেই সুষ্ঠুরূপে রসায়ন বিজ্ঞান আলোচনা, অধ্যয়ন ও বহুল ব্যবহারের জন্য একে আবার কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা হয়। বিভক্ত শাখাগুলো নিম্নরূপ:
১. ভৌত রাসায়ন
২. জৈব রসায়ন
৩. অজৈব রসায়ন
৪. প্রাণ রসায়ন
৫. ফলিত রসায়ন
৬.ভেষজ রসায়ন
৭. নিউক্লিয়ার রসায়ন
৮. বিশ্লেষণমূলক রসায়ন এবং
৯.মহাশূন্য রসায়ন ইত্যাদি।

রসায়নের ইতিহাস

জানা যায়, রসায়নের ইতিহাস সুপ্রাচীন। সভ্যতার আদি যুগ হতে রসায়নবিদ্যার বিকাশ। বস্তুর ধর্ম, গুণাগুণের বিকাশ, পর্যালোচনা ও ব্যবহারবিধি প্রভৃতি মানুষ আদি যুগ হতেই চর্চা করে আসছে। কিন্তু রসায়নবিজ্ঞান নামে কোনো সুনির্দিষ্ট জ্ঞান-শাখা তখনো গড়ে উঠেনি। খনি থেকে ধাতু নিষ্কাশন, কাচ ও সাবানের ব্যবহার, ঔষধে লতা-গুল্মের ব্যবহার, বিভিন্ন সুগন্ধ দ্রব্যের ব্যবহার ইত্যাদি ফলিত রসায়নের প্রাচীন প্রমাণ ও পরিচয় বহন করে। যদিও সকলের পিছনে কোনো সুনির্দিষ্ট রাসায়নিক জ্ঞান ছিল না, তথাপি প্রাচীন রসায়নের সূত্রপাত হিসাবে এসব স্মরণীয়।
জানা যায়, অতি প্রাচীন কাল থেকে এমন কি হযরত ঈসা(আ:) এর জন্মের শত শত আগে চীনে ও ভারতে খনিজ পদার্থ হতে নানা রকমের ধাতু প্রস্তুত করা হত। গাছপালা ও তৃণ-গুল্ম হতে নানা রকম ঔষধ প্রস্তুত করা হত। এ সব কাজে বিভিন্ন পদ্ধতি চালু ছিল বলে মনে করা হয়।
প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার যুগে গ্রীসে(খ্রী:পূ: ৬০০-৭০০ বছর) রসায়নের বিস্তৃত আলোচনা ছিল বলে ধারণা করা হয়। এনাকজোগোরাস্, ডেমোক্রিটাস, লিউকিম্পাস, এরিস্টটল প্রমুখ গ্রীক পন্ডিত পদার্থের গঠন ও উপাদান সম্পর্কে নানা মতবাদ প্রচার করেন। সূর্যকে একটি তপ্ত পাথর, চাঁদকে এক রকম মাটি বলে তাঁরা মনে করতেন।
সপ্তম শতাব্দীতে মিশরে রসায়ন আলোচনার প্রসার ঘটে। নীল নদের উপত্যকার কাল মাটি দিয়ে মিশরীয়গণ নানা প্রকার দ্রব্যাদি প্রস্তুত এর চেষ্টায় ব্রতী হন। আলেকজান্দ্রিয়ায় ধাতব পদার্থ ও কাচ নির্মাণ এ রসায়নের ব্যাপক চর্চা হয়। মিশরের ‘কাল জমি’ শব্দ থেকেই এ সময়ে রসায়নের নামকরণ করা হয় ‘কিমিয়া’। প্রকৃতপক্ষে কিমিয়া অর্থই কাল জমি। সম্ভবত মিশরীয়গণের দেয়া এই কিমিয়া নাম হতেই বর্তমান কালের রসায়নের ইংরেজি নাম কেমিস্ট্রী(Chemistry) উদ্ভূত।
মিশরীয় যুগের শেষে বাগদাদে রসায়নে ব্যবহৃত বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়। এ সময় ইসলামী সভ্যতার প্রভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয় এবং বহুল সংখ্যক মুসলমান রসায়নবিজ্ঞানর আবির্ভাব ঘটে। তাঁরা নান রকম বস্তু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ এর দ্বারা বহুবিধ রাসায়নিক দ্রব্য তৈরি করেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় রসায়ন শাস্ত্রে প্রভূত উন্নতি ঘটে ও এ সময় রসায়নের নামকরণ করা হয় আল-কেমি(Al-chemy), আর এই আল-কেমিবিদদের প্রধান ছিলেন জাবির ইবনে হাইয়ান ও রাজি। মনীষী জাবেরকে রসায়নবিজ্ঞানের নিউটন বলা হয়। জাবির ও আরো কয়েকজন বিজ্ঞানী নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। এ যুগে আরবীয় রসায়নবিদগণ মনে করতেন, রসায়ন চর্চার মূল উদ্দেম্য ‘পরশ পাথর'(Philosopher’s stone) আবিষ্কার, যার সাধারণ স্পর্শে নিকৃষ্ট ধাতুকেও স্বর্ণে পরিণত করা যায়।
আরব হতে দ্বাদশ বা চতুর্দশ শতাব্দীতে ল্যাটিন ইউরোপে রসায়নবিদ্যার প্রসার ঘটে। এ সময় ইউরোপে যে রসায়ন চর্চা হত তা ছিল অনেকটা আল-কেমিদের ধারা অনুসৃত। সে যুগের উল্লেখযোগ্য রসায়ন বিজ্ঞানী ছিলেন রোজার বেকন(১২১৪-৯৮)। ষোড়শ শতাব্দীতে বিজ্ঞানী প্যারাসেলসাস এর নেতৃত্বে একদল রসায়নবিদের উদ্ভব হয়। এঁদের ধারণা ছিল রসায়নের সাহায্যে জীবনকে রোগমুক্ত করে অমরত্ব দেয়া যায়। এর ফলে রসায়ন চিকিৎসাশাস্ত্রের অন্তর্ভূক্ত হয়ে পড়ে।
পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ ধারা সিদ্ধান্তে উপনীত হবার প্রচেষ্টা আরম্ভ হয় সপ্তদশ শতাব্দীতে আইরিশ বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েলের সময় থেকে। এ সময় নানা রকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে যুক্তি-তর্কের সাহায্যে কোনো বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হবার প্রবণতা দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা মৌলিক তত্ত্ব আবিষ্কারের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। অষ্টদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সে ল্যাভয়সিয়ে ও বার্থোলে, ইংল্যান্ডে প্রিস্টলি ও ক্যাভেন্ডিস, সুইডেনে শীলে প্রমুখ প্রথিতযশা বিজ্ঞানী বহু পরীক্ষা সম্মত মতবাদ দ্বারা বিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে তোলেন। তাদের অবদান রসায়নে বহু নতুন আবিষ্কার ও তত্ত্বের প্রতিষ্ঠার দ্বারা সমৃদ্ধি লাভ করে।
সমাপ্ত হলেও হয় নি——এরপর—আধুনিক যুগ—–সর্বাধুনিক যুগ—–এর পরও চলবে পৃথিবীর অন্তিম কাল পর্যন্ত।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x