প্রকৃতি কাকে বলে?

ক্রিয়াপদের মূল ও শব্দ উভয়কেই প্রকৃতি বলে। অর্থাৎ যে শব্দকে বা কোনো শব্দের যে অংশকে আর কোনো ক্ষুদ্রতর অংশে ভাগ করা যায় না, তাকে প্রকৃতি বলে।

প্রকৃতির প্রকারভেদ 

প্রকৃতি দুই প্রকার। যথাঃ–
ক. নামপ্রকৃতি ও
খ. ক্রিয়াপ্রকৃতি।

ক. নামপ্রকৃতি : নামপদের মূল অংশকে বলে নামপ্রকৃতি। ‘ছেলেরা’ (ছেলে + রা) শব্দের মূল অংশ ‘ছেলে’ একটি নাম। তাই একে নামপ্রকৃতি বলা যায়। আর ‘রা’ হলো বিভক্তি।

খ. ক্রিয়াপ্রকৃতি : ক্রিয়াপদের মূল অংশকে বলে ক্রিয়াপ্রকৃতি। ‘করা’ (কর + আ) শব্দের মূল অংশ ‘কর’ হলো ক্রিয়াপ্রকৃতি আর ‘আ’ হলো বিভক্তি।

প্রত্যয় কাকে বলে?
যে বর্ণ বা বর্ণ সমষ্টি ধাতু বা শব্দের উত্তর (পরে) যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে, তাকে প্রত্যয় বলে। যেমন— চল + আ = চলা, দেশ + ই = দেশি। এখানে চল ধাতুর সাথে আ বর্ণ যুক্ত হয়ে ‘চলা’ শব্দ গঠিত হয়েছে এবং দেশ শব্দের সাথে ‘ই’ বর্ণ যুক্ত হয়ে ‘দেশি’ শব্দ গঠিত হয়েছে। এখানে ‘আ’ এবং ‘ই’ হচ্ছে প্রত্যয়।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, “ধাতু বা শব্দের উত্তর ভিন্ন ভিন্ন অর্থে যে বর্ণ বা বর্ণসমূহ যুক্ত হইয়া শব্দ প্রস্তুত হয়, তাহাদিগকে প্রত্যয় বলে।”

ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, “যাহা ধাতুর উত্তর যুক্ত হইয়া নাম শব্দ (বা নতুন ধাতু) গঠন করে কিংবা নাম শব্দের উত্তর যুক্ত হইয়া নতুন শব্দ গঠন করে তাহাকে প্রত্যয় বলে।’’

ড. এনামুল হকের মতে, “নাম প্রকৃতির আগে- পাছে কিছু যোগ না করিলেও এইগুলি শব্দরূপে গণ্য হয় তথাপি বাক্যে প্রয়োগ করিতে গেলে এই নাম প্রকৃতির সহিত বিভক্তির চিহ্ন যোগ করিতে হয়। ধাতুগুলি প্রত্যয় বা বিভক্তি যুক্ত না হইয়া শব্দরূপে ব্যবহৃত হয় না। যে সমস্ত ধাতু শব্দরূপে ব্যবহৃত হইতে দেখা যায়, সেই গুলিতে একটি শূন্য প্রত্যয় আছে বলিয়া ধরিয়া লইতে হয় না।”

প্রত্যয়ের প্রকারভেদ
প্রত্যয় শব্দ গঠন করে। তাই প্রত্যয় কখনও ধাতুর শেষে আবার কখনও শব্দের শেষে যুক্ত হয়। ‘ধাতু’ হচ্ছে ক্রিয়ার মূল অংশ। প্রত্যয়ের সাহায্যে গঠিত শব্দকে বিশ্লেষণ করলে উৎস হিসেবে মূলে কখনও ধাতু আবার কখনও শব্দ পাওয়া যায়। শব্দের এই মূলের নাম প্রকৃতি। ধাতু বা শব্দ যার সঙ্গে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে সে মূল অংশের নাম প্রকৃতি। যেমন– মিঠা + আই = মিঠাই। এখানে ‘মিঠা’ হচ্ছে প্রকৃতি, এর সঙ্গে ‘আই’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে, আর সেই শব্দ ভাষায় ব্যবহৃত হয়। প্রত্যয়ের ব্যাপারে ধাতু ও শব্দের পার্থক্য সম্পর্কে সচেতন থাকা আবশ্যক।

ধাতু ও শব্দের শেষে প্রত্যয় যুক্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্যয়কে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন— ১. কৃৎপ্রত্যয় ও ২. তদ্ধিত প্রত্যয়।

১. কৃৎপ্রত্যয় : যে সব প্রত্যয় ক্রিয়ার মূল বা ধাতুর পরে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে তাদেরকে কৃৎপ্রত্যয় বলে। কৃৎ-প্রত্যয়যোগে যে সব শব্দ গঠিত হয় তাদেরকে কৃদন্ত শব্দ বলে। যেমন– বাট + না = বাটনা, রাঁধ + না = রান্না। কৃৎ-প্রত্যয়ের ক্ষেত্রে ধাতু বুঝানোর জন্য প্রকৃতির পূর্বে ধাতুর চিহ্ন (√) ব্যবহার করা হয়। যেমন– √ফুট + অন্ত = ফুটন্ত। এখানে ‘ফুট’ হচ্ছে ধাতু বা প্রকৃতির, এর পূর্বে (√) চিহ্ন দিতে হবে, ‘অন্ত’ হচ্ছে প্রত্যয় এবং নব গঠিত ‘ফুটন্ত’ শব্দটি হচ্ছে কৃদন্ত শব্দ।

২. তদ্ধিত প্রত্যয় : শব্দের উত্তর (পরে) যে সব প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে, তাদেরকে তদ্ধিত প্রত্যয় বলে। তদ্ধিত প্রত্যয় যোগে যেসব শব্দ গঠিত হয় তাদেরকে তদ্ধিতান্ত শব্দ বলে। যেমন— বাড়ি + ওয়ালা বাড়িওয়ালা, ছাপাখানা, এখানে ‘বাড়ি’ ও ‘ছাপা’ শব্দের সাথে যথাক্রমে ‘ওয়ালা’ ও ‘খানা’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে বাড়িওয়ালা ও ছাপাখানা শব্দদ্বয় গঠিত হয়েছে। তাই বাড়িওয়ালা ও ছাপাখানা তদ্ধিতান্ত শব্দ। বাংলায় স্ত্রীবাচক শব্দ বুঝাবার জন্য পুংলিঙ্গ শব্দের শেষে এক ধরনের প্রত্যয় যুক্ত হয়ে তার স্ত্রীলিঙ্গ রূপ গঠিত হয়। এগুলোকে স্ত্রী প্রত্যয় বলে। যেমন– পিতামহ + ঈ পিতামহী। এখানে ‘ঈ’ স্ত্রী প্রত্যয়। একে তদ্ধিত প্রত্যয় বলা সমীচীন নয়।

বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ সংস্কৃতের নিজস্ব প্রত্যয়যোগে সাধিত হয়, আবার খাঁটি বাংলা শব্দও বাংলার নিজস্ব প্রত্যয় দ্বারা নিষ্পন্ন। বাংলা ভাষায় অসংখ্য তৎসম শব্দের প্রবেশ ঘটেছে। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত সাধিত শব্দের প্রকৃতি জানতে হলে এ রূপ শব্দের ব্যুৎপত্তি জানা দরকার। তাই বাংলা ভাষার ব্যাকরণে নিজস্ব প্রত্যয় ছাড়াও সংস্কৃত প্রত্যয় সম্পর্কে আলোচনা থাকে। এ কারণে বাংলা ভাষার ব্যাকরণে প্রত্যয়কে বাংলা ও সংস্কৃত এ শ্রেণীতে নির্ণয় করা চলে। বাংলা ভাষায়- ১. বাংলা কৃৎপ্রত্যয়, ২. সংস্কৃত কৃৎ-প্রত্যয়, ৩. বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয় ও ৪. সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়— এ চার শ্রেণীর প্রত্যয় পাওয়া যায়। এ ছাড়া বাংলা ভাষায় কিছু বিদেশি প্রত্যয়ও ব্যবহৃত হয়।

প্রকৃতি ও প্রত্যয়ের মধ্যে পার্থক্য কি?

প্রকৃতি ও প্রত্যয়ের মধ্যে পার্থক্য নিম্নরূপ:–
প্রকৃতি
১. প্রত্যয় সাধিত শব্দ থেকে প্রত্যয় বাদ দিলে যে অংশটুকু থাকে, তারই নাম প্রকৃতি। যেমন– ধন + ঈ = ধনী। এখানে ‘ধন’ হল প্রকৃতি।
২. প্রকৃতি হল মূল বা ধাতু।
৩. প্রকৃতির নিজস্ব অর্থ আছে।

প্রত্যয়
১. শব্দ বা ধাতুর শেষে যে বর্ণ বা বর্ণ সমষ্টি যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠিত হয় তার নামই প্রত্যয়। যেমন – সাপ + উড়ে = সাপুড়ে। এখানে ‘উড়ে’ হচ্ছে প্রত্যয়।
২. প্রত্যয় হল নতুন শব্দ গঠন করার একটা সহজ উপাদান। প্রকৃতির সাথে যুক্ত হয়ে নতুন নতুন শব্দ গঠন করাই প্রত্যয়ের লক্ষ্য।
৩. প্রত্যয় অর্থহীন বর্ণ বা বর্ণ সমষ্টি মাত্র। এদের নিজস্ব কোন অর্থ নেই।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x