আইসি কি? (What is IC in Bengali/Bangla?)
আইসি হলো ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট বা সমন্বিত বর্তনীর সংক্ষিপ্ত রূপ। এটি সিলিকনের মতো অর্ধপরিবাহী ব্যবহার করে তৈরি এমন একটি নির্মাণ যাতে আমাদের আঙ্গুলের নখের সমান জায়গায় লক্ষ লক্ষ আণুবীক্ষণিক তড়িৎ বর্তনী অঙ্গীভূত থাকে। কম্পিউটার, মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে মাইক্রোওভেন পর্যন্ত যত রকম বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি দেখা যায় তার অধিকাংশটিতেই আইসি দেখা যায়। আইসির কারণে আমরা অনেক সৃজনশীল ডিভাইস পেয়েছি।

আইসির ইতিহাস (History of IC)
১৯৫০ সালে টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টস ইউএস (Texas Instruments USA) এর জ্যাক কিলবি (Jack Kilby) এবং ফেয়ারচাইল্ড সেমিকন্ডাক্টর ইউএস (Fairchild Semiconductor USA) এর রবার্ট নয়েস (Robert Noyce) এই প্রযুক্তিটি আবিষ্কার করেছিলেন। এই নতুন আবিষ্কারের প্রথম কাস্টমার ছিলেন মার্কিন বিমান বাহিনী।

২০০০ সালে জ্যাক কিলবি (Jack Kilby) মিনিয়েচারাইজড ইলেকট্রনিক সার্কিটে (Miniaturized Electronic Circuit) এর জন্য পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার জিতেছিলেন।

জ্যাক কিলবি তার ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট ডিজাইন প্রদর্শনের দেড় বছর পরে, ফেয়ারচাইল্ড সেমিকন্ডাক্টর লিমিটেডের রবার্ট নয়েস তার নিজস্ব ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট নিয়ে এসেছিল। রবার্ট নয়েস এর নতুন মডেল কিলবির ডিভাইসে থাকা অনেক ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতার সমাধান করে।

তিনি এটি ডিজাইন করেছিলেন সিলিকন দিয়ে, যেখানে কিলবির ডিজাইনটি ছিল জার্মিনিয়াম দিয়ে। জ্যাক কিলবি এবং রবার্ট নয়েস উভয়ই ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটের কাজের জন্য মার্কিন পেটেন্ট (US patents) পেয়েছিলেন। বেশ কয়েক বছরের আইনী সমস্যার পরে উভয় সংস্থা তাদের প্রযুক্তির ক্রস লাইসেন্স গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন এবং একটি বিশাল বৈশ্বিক বাজার তৈরি করেন।

আইসি কত প্রকার ও কি কি?
বিভিন্ন পরিমিতির উপর ভিত্তি করে (যেমন-ট্রানজিস্টর সংখ্যা, অ্যাক্টিভ ডিভাইস) আইসির শ্রেনিবিভাগ করা হয়েছে। তবে মূলত দুই ধরনের আইসি রয়েছে। যথা-
১. এনালগ আইসি (Analog IC) এবং
২. ডিজিটাল আইসি (Digital IC)

১. এনালগ আইসি (Analog IC)
এই জাতীয় আইসিতে ইনপুট এবং আউটপুট উভয় সংকেতই অবিচ্ছিন্ন থাকে। এদেরকে লিনিয়াট আইসিও বলা হয়। এদের আউটপুট সিগন্যাল স্তর ইনপুট সিগন্যাল স্তরের উপর নির্ভর করে এবং আউটপুট সিগন্যাল স্তরটি ইনপুট সিগন্যাল স্তরের লিনিয়ার ফাংশন (Linear Function) হয়।

লিনিয়ার আইসি বা অ্যানালগ আইসিগুলি সাধারণত অডিও ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্ধক (audio frequency amplifier) এবং রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্ধক (radio frequence amplifier) হিসাবে ব্যবহৃত হয়। Op amps, voltage regulators, comparators এবং Timer গুলো হলো লিনিয়ার আইসি বা এনালগ আইসির সুপরিচিত উদাহরণ।

২. ডিজিটাল আইসি (Digital IC)
লজিক গেট যেমন AND gate, OR gate, NAND gate, XOR gate, flip flops এবং microprocessor গুলো হলো ডিজিটাল ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটের কিছু সুপরিচিত উদাহরণ। এই আইসিগুলো বাইনারি ডেটা যেমন 0 বা 1 নিয়ে অপারেট করে। সাধারণত ডিজিটাল সার্কিটে 0 মানে হলো 0 ভোল্ট এবং 1 মানে হলো 5 ভোল্ট। বর্তমানে বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক প্রজেক্টে ডিজিটাল আইসি ব্যবহার করা হয়।

আইসির প্রধান উপাদান হলো ট্রানজিস্টর। আইসির এর ব্যবহার ভেদে এই ট্রানজিস্টর বাইপোলার বা ফিল্ড এফেক্ট ট্রানজিস্টর হতে পারে। যেহেতু দিন দিন প্রযুক্তির উন্নতি হচ্ছে, সেই সাথে একটি একক আইসি চিপে অন্তর্ভুক্ত ট্রানজিস্টারের সংখ্যাও বাড়ছে।

একটি একক চিপে অন্তর্ভুক্ত ট্রানজিস্টারের সংখ্যার উপর নির্ভর করে আইসিগুলোকে পাঁচটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। যেমন-

Group-1: Small Scale Integration (SSI): যেখানে একটি একক আইসি চিপে ১-১০০ টি ট্রানজিস্টর অন্তর্ভুক্ত থাকে।

Group-2: Medium Scale Integration (MSI): যেখানে ১০০-১০০০ টি ট্রানজিস্টর একটি একক আইসি চিপে অন্তর্ভুক্ত থাকে।

Group-3: Large Scale Integration (LSI): এখানে ১০০০-২০,০০০ টি ট্রানজিস্টর একক আইসি চিপে অন্তর্ভুক্ত থাকে।

Group-4: Very Large Scale Integration (VLSI): ভিএলএসআই হয় যখন একটি একক আইসি চিপে ২০,০০ থেকে ১০,০০,০০০ ট্রানজিস্টর অন্তর্ভুক্ত থাকে।

Group-5: Ultra Large Scale Integration (ULSI): যেখানে একটি একক আইসি চিপে ১০,০০,০০০ থেকে ১,০০,০০,০০০ ট্রানজিস্টর অন্তর্ভুক্ত থাকে।

আইসি-তে ব্যবহৃত সক্রিয় ডিভাইসের উপর নির্ভর করে এটিকে আবার বাইপোলার আইসি (Bipolar IC) এবং ইউনিপোলার আইসি (Unipolar IC) হিসাবে শ্রেণীবিভাগ করা হয়েছে।

বাইপোলার আইসিগুলোতে প্রধান উপাদান হলো বাইপোলার জংশন ট্রানজিস্টর হয়, তবে ইউনিপোলার আইসিতে মূল উপাদান হলো ফিল্ড এফেক্ট ট্রানজিস্টর বা এমওএসএফইটি (MOSFET)।

আইসির সুবিধা (Advantages of IC)

  • স্বল্প সংখ্যক সংযোগ থাকায় এর বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বেশি।
  • আকার অত্যন্ত ছোট। প্রায় 20,000 ইলেক্ট্রনিক উপাদান আইসি চিপের একক বর্গ ইঞ্চি জায়গার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
  • অনেক জটিল সার্কিট একটি একক চিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং তাই এটি একটি জটিল বৈদ্যুতিক সার্কিটের নকশাকে সহজতর করে। এছাড়াও এটি সার্কিটের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
  • ওজনে হালকা।
  • একসাথে অনেকগুলো চিপ তৈরি হয় বলে মূল্য খুবই কম।
  • কম বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়।
  • তাপমাত্রা কম বেশি হলেও এর কার্যকারিতা সহজে নষ্ট হয় না।
  • প্যারাসাইটিক ক্যাপাসিট্যান্স প্রভাব না থাকায় এদের অপারেটিং গতি অনেক উচ্চ হয়।

আইসির অসুবিধা (Disadvantages of IC)

  • চিপের অংশগুলো আলাদা করা যায় না বা পুনঃস্থাপন করা যায় না। ফলে নষ্ট হলে মেরামত করা সম্ভব হয় না।
  • এর আকার ছোট হওয়ায় কারেন্ট বৃদ্ধির সাথে সাথে এটি প্রয়োজনীয় হারে তাপ নিঃসরণ করতে সক্ষম হয় না। এজন্য প্রায়শই আইসিগুলো অতিরিক্ত কারেন্ট প্রবাহিত হওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x