বহুদিনের চেষ্টা, সাধনা, উদ্ভাবনী শক্তি ও গবেষণার ফসল বর্তমানের কম্পিউটার। বিভিন্ন পর্যায়ে এর ক্রমপরিবর্তন, উন্নয়ন, পরিবর্ধন ও বিকাশ লাভের পর কম্পিউটার বর্তমান অবস্থায় এসেছে। এই পরিবর্তনসমূহ প্রধানত ইলেকট্রনিক কৌশলের ওপর ভিত্তি করে হয়েছে। এই পরিবর্তন বা বিকাশের একেকটি ধাপকেই কম্পিউটার প্রজন্ম বা জেনারেশন নামে অভিহিত করা হয়।

কম্পিউটার প্রজন্মকে কত ভাগে ভাগ করা হয়?
কম্পিউটার প্রজন্মকে মোটামুটি পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়। এগুলো হলোঃ-
১। প্রথম প্রজন্ম (১৯৪৬-৫৯) (First Generation)
২। দ্বিতীয় প্রজন্মের কম্পিউটার (১৯৫৯-৬৫) (Second Generation)
৩। তৃতীয় প্রজন্মের কম্পিউটার (১৯৬৫-৭১) (Third Generation)
৪। চতুর্থ প্রজন্মের কম্পিউটার (১৯৭১ – বর্তমান) (Fourth Generation)
৫। পঞ্চম প্রজন্মের কম্পিউটার (Fifth Generation)

প্রথম প্রজন্ম (১৯৪৬-৫৯) (First Generation)
প্রথম প্রজন্মের কম্পিউটারগুলো হলো সর্বপ্রথম ইলেকট্রনিক ডিজিটাল কম্পিউটার। ১৯৪৫ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী লি ডি ফরেস্ট ট্রায়োড ভালব আবিষ্কার করেন। ১৯৪৬ সালে আমেরিকার পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন মসলি (Mauchly) ও প্রেসপার একার্ট যৌথভাবে বৃহদাকার ইলেকট্রনিক কম্পিউটার তৈরি করেন। তাঁর এই কম্পিউটারটির নাম দেন ‘এনিয়াক’ (ENIAC)। আর এনিয়াক হচ্ছে বিশ্বের প্রথম ইলেকট্রনিক কম্পিউটার। এই কম্পিউটারে ১৯ হাজার ডায়োড ও ট্রায়োড ভালব, ৭০ হাজার রেজিস্টার, ৬০ হাজার সুইচ, ১০ হাজার ক্যাপাসিটর ছিল। তিশ (৩০) টন ওজনের এই কম্পিউটার চালানোর জন্য প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুৎ শক্তি ব্যয়িত হতো ১৫০ কিলোওয়াট। এটি দ্বারা প্রতি সেকেন্ডে ৫০০০ যোগ অথবা ৩৫০ টি গুণ করা যেত। এটি দশমিক পদ্ধতিতে কাজ করত। বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে, জন মশলি ও প্রেসপার একার্ট ১৯৪৬ সালে একটি কোম্পানি গঠন এবং ১৯৫১ সালে প্রথম ইউনিভ্যাক-১ (UNIVAC-1) কম্পিউটার তৈরি করেন। এই ইউনিভ্যাকই ছিল প্রথম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তৈরি ইলেকট্রনিক কম্পিউটার। ১৯৫২ সালে IBM-701 এবং IBM-650 কম্পিউটার বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তৈরি ও বাজারজাত করে।

উদাহরণ : UNIVAC-I, IBM-701, IBM-650, IBM-704, IBM-709, MARK-II, MARK-III.

বৈশিষ্ট্য :

  • প্রথম প্রজন্মের কম্পিউটার দশমিক পদ্ধতিতে কাজ করত।
  • এটি বৃহদাকার ইলেকট্রনিক কম্পিউটার ছিল।
  • এটিতে ডায়োড ও ট্রায়োড ভালব ব্যবহৃত হতো।
  • এটি দ্বারা প্রতি সেকেন্ড ৫০০০ যোগ বা ৩৫০ টি গুণ করা যেত।
  • এটিতে প্রতি ঘণ্টায় ১৫০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎশক্তি ব্যয়িত হতো।
  • এটি বসাতে দৈর্ঘ্যে ৯ মিটার এবং প্রস্থে ১৫ মিটার জায়গার প্রয়োজন হতো।
  • এটি কাজের সময় খুব গরম হতো।
  • মাঝে মাঝে পানি দিয়ে এটিকে ঠাণ্ডা করা হতো।
  • এটি সীমিত তথ্য ধারণ করতে পারত।
  • এটি কম নির্ভরযোগ্যতা সম্পন্ন একটি যন্ত্র।
  • প্লাগ বোর্ড দিয়ে প্রোগ্রাম চালনা করা হতো।
  • এটি নড়াচড়া ও রক্ষণাবেক্ষণ করা বড় সমস্যার বিষয় ছিল।

দ্বিতীয় প্রজন্মের কম্পিউটার (১৯৫৯-৬৫) (Second Generation)
১৯৪৭ সালে জন বারডিন, উইলিয়াম শকলে ও ওয়াল্টার ব্রাটেইন ট্রানজিস্টর (Transistor) আবিষ্কার করেন। ভ্যাকুয়াম টিউবের চেয়ে ট্রানজিস্টর আকারে অনেকগুণ ছোট। ট্রানজিস্টর আবিষ্কার কম্পিউটারের ইতিহাসে বিরাট পরিবর্তন এনে দেয়। ট্রানজিস্টর আবিষ্কৃত হওয়ার পরে কম্পিউটারেও এর ব্যবহার ঘটতে আরম্ভ হয়। ট্রানজিস্টর ব্যবহৃত কম্পিউটার দ্বিতীয় প্রজন্মের (Second generation) কম্পিউটার। ট্রানজিস্টর আকারে অনেক ছোট হওয়ায় দ্বিতীয় প্রজন্মের কম্পিউটার প্রথম প্রজন্ম থেকে আকারে ছোট হয়ে এল অথচ তার রইল দ্রুত কাজ করার ক্ষমতা। হাই লেভেল ভাষার ব্যবহার শুরু হয় এই প্রজন্মে। এ থেকে FORTRAN, COBOL ভাষার প্রচলন শুরু হয়।

উদাহরণ : IBM-1400, 1401, IBM- 1600, 1620, RCA-501, NCR-300, GE-200 ইত্যাদি।

বৈশিষ্ট্য :

  • এটি আকারে ছোট।
  • ভ্যাকুয়াম টিউবের পরিবর্তে ট্রানজিস্টর ব্যবহৃত হয়।
  • এতে বিদ্যুৎ খরচ কম হয় এবং সময়ও কম লাগে।
  • এটি দামে সস্তা।
  • এটি দ্রুতগতিসম্পন্ন।
  • তাপ সমস্যার অবসান, গতি ও নির্ভরযোগ্যতার উন্নতি হয়।
  • অভ্যন্তরীণ স্মৃতি হিসেবে চুম্বকীয় কোরের ব্যবহার।
  • FORTRAN, COBOL ভাষার প্রচলন শুরু।
  • যন্ত্রাংশ গরম হয় না, ফলে পানি ঢালার প্রয়োজন পড়ে না।

তৃতীয় প্রজন্মের কম্পিউটার (১৯৬৫-৭১) (Third Generation)
ট্রানজিস্টরের পরে এল Integrated Circuit (IC)। এই সার্কিটকে একটি সূক্ষ্ম সার্কিট বলা যায়। ১৯৬৩ সালের পর IC আবিষ্কৃত হয়। অনেকগুলো ডায়োড ও ট্রানজিস্টরের মতো বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ দিয়ে যে সার্কিট (Curcit) তৈরি করা হয় তাকে IC বলা হয়। উক্ত IC দিয়ে তৈরি কম্পিউটারকে তৃতীয় প্রজন্মের কম্পিউটার বলা হয়ে থাকে। এটি আকারে ছোট, দ্রুতগতিতে কাজ করা যায় এবং সময়ও লাগে কম। আবার অর্ধপরিবাহী পদার্থের টুকরো ‘সেমিকন্ডাক্টর চিপ’ ও এ প্রজন্মের কম্পিউটারে ব্যবহৃত হয়। প্রথম আইসি তৈরি হয়েছিল একটি সরু ও লম্বা জার্মেনিয়াম অর্ধপরিবাহী চিপের ওপর। একটি আইসি চিপ প্রস্থে ৬ মিলিমিটার, লম্বায় ১৮ মিলিমিটার এবং উচ্চতায় ২ থেকে ৩ মিলিমিটার। এর সময়কাল ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত।

উদাহরণ : IBM- 370, PDP-8, IBM-360, IBM-350, GE-600 ইত্যাদি।

বৈশিষ্ট্য :

  • ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (IC) ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়।
  • এটি কম দামে ক্রয় করা যায়।
  • এটি আকারে ছোট।
  • এটি সহজে বহন করা যায়।
  • এতে বিদ্যুৎশক্তি কম খরচ হয়।
  • অর্ধপরিবাহী স্মৃতির উদ্ভব ও বিকাশ।
  • উন্নত কার্যকরিতা ও নির্ভরযোগ্যতা।
  • বিভিন্ন ধরনের উন্নত কম্পিউটার যন্ত্রাংশ। যেমন- স্মৃতির ব্যবস্থার জন্য Magnatic tap, Hard Disk Drive উদ্ভাবন।
  • বিভিন্ন ধরনের প্রোগ্রামিং করার ব্যবস্থা।
  • আউটপুট হিসাবে ভিডিও ডিসপ্লে ইউনিট এবং দ্রুতগতিসম্পন্ন লাইন প্রিন্টারের ব্যবহার।
  • অত্যধিক কর্মক্ষমতা।
  • উচ্চতর ভাষার বহুল ব্যবহার।

চতুর্থ প্রজন্মের কম্পিউটার (১৯৭১ – বর্তমান) (Fourth Generation)
বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে কম্পিউটার আইসির (IC) মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এরপরে আইসি তৈরির ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি হতে থাকে। প্রথম দিকে খুব অল্প সংখ্যক যন্ত্রাংশের সমন্বয়ে এই আইসি তৈরি হতো। একে Large Scale Integration (LSI) থেকে Very Large Scale Integration (VLSI)-এ উন্নীত করা হয়। এ জাতীয় কম্পিউটারকে চতুর্থ প্রজন্মের কম্পিউটার বলা হয়। এতে লাখের বেশি ট্রানজিস্টর সংযুক্ত থাকে। আইসির দ্রুত উন্নয়নের ফলে কম্পিউটারের পুরো কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়াকরণ অংশকে একটি আইসি চিপ আকারে রাখা সম্ভব হয়। এই চিপকেই মাইক্রোপ্রসেসর বলে। এই মাইক্রোপ্রসেসর তৈরি হয় ১৯৭১ সালে। ফলে মাইক্রো কম্পিউটার ওই সময়ের কিছু পরেই বাজারে দেখা যায়। এই ‘মাইক্রোপ্রসেসর’ একটি ছোট সিলিকন পদার্থের চিপে তৈরি। এটি আকারে ৫ বর্গ মিলিমিটার এবং বেধে ১ মিলিমিটার। একটি চিপ কম্পিউটারের কয়েকটি অংশ সমন্বিত। এই সব নতুন যন্ত্র বেরোনোর ফলে এখনকার একবারে ছোট কম্পিউটারও ষাটের দশকের যে কোন বড় কম্পিউটারের তুলনায় বেশি কার্যক্ষম। কিন্তু ১৯৬৯ সালে ইন্টেল কোম্পানি ৪০০০ নামে প্রথম মাইক্রোপ্রসেসর তৈরি করে। ১৯৭১ সালে ইন্টেল আরো শক্তিশালী মাইক্রোপ্রসেসর ইন্টেল ৪০০৪ তৈরি করে। এরপর তারা তৈরি করে ৮০০৮ প্রসেসর। এই ইন্টেল ১৯৭৪ সালে ৮০০৮ মাইক্রোপ্রসেসর তৈরি করে কম্পিউটারকে মানুষের দ্বারপ্রান্তে এনে দেয়। মাইক্রোপ্রসেসর শিল্পে বর্তমানে চলছে গতির লড়াই। একচ্ছত্রাধিপতি ইন্টেলকে পেছনে ফেলে এএমডি ৬৪ বিট আর্কিটেকচারের নতুন প্রসেসর তৈরি করছে। অর্থাৎ ৮৬ আর্কিটেকচার যাকে বলা হবে ‘৮৬ -৬৪ ’। ইন্টেলের পেন্টিয়াম-থ্রি আর সেলেরন প্রসেসর, যেগুলোর ক্লক স্পিড ৩০০-৬০০ মেগাহার্টজ। আর এএমডির এথলন প্রসেসর , যার ক্লক স্পিড ৭০০ মেগাহার্টজ।

উদাহরণ : IBM-3033, HP-3000, IBM-4341, TRS-80, IBM-PC ইত্যাদি।

বৈশিষ্ট্য :

  • আকারে ছোট বিধায় সহজে বহনযোগ্য।
  • বিদ্যুৎশক্তি কম খরচ হয়।
  • এটি ব্যাটারি দিয়েও চালানো যায়।
  • উন্নত ধরনের স্মৃতি ব্যবস্থার উদ্ভব।
  • বৃহৎ ও অতি বৃহৎ মানের আইসির (LSI, VLSI) ব্যবহার।
  • ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি।
  • মাইক্রোপ্রসেসরের প্রচলন।
  • উন্নত ধরনের High Level প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজের উদ্ভব।

পঞ্চম প্রজন্মের কম্পিউটার (Fifth Generation)
পঞ্চম প্রজন্মের কম্পিউটার বলা হচ্ছে কম্পিউটারের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। পঞ্চম প্রজন্মের কম্পিউটার হবে কৃত্রিম বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ করার ক্ষমতাসম্পন্ন। কৃত্রিম বুদ্ধি থাকার জন্য পঞ্চম প্রজন্মের কম্পিউটারের চিন্তাভাবনা ও বিচার-বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা থাকবে। নতুন পরিস্থিতিতে কী করতে হবে তা এরা নিজেরাই বুদ্ধি দিয়ে ঠিক করে নেবে। এই কম্পিউটারের মানুষের কণ্ঠস্বর শনাক্ত করার ক্ষমতাও থাকবে। মানুষের কণ্ঠে দেয়া নির্দেশ অনুধাবন করে পঞ্চম প্রজন্মের কম্পিউটার কাজ করতে পারবে। আর পঞ্চম প্রজন্মের কম্পিউটারের কাজের গতি, স্মৃতির ধারণক্ষমতা যে বিস্ময়কররূপে বৃদ্ধি পাবে, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বৈশিষ্ট্য :

  • কৃত্রিম বুদ্ধি থাকার কারণে যে কোন বিষয়ে চিন্তাভাবনা ও বিচার-বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা থাকবে।
  • তথ্য ধারণক্ষমতার ব্যাপক উন্নতি ঘটবে।
  • স্বয়ংক্রিয় অনুবাদ করার ক্ষমতা থাকবে।
  • অধিক শক্তিশালী মাইক্রোপ্রসেসর থাকবে।
  • মানুষের কণ্ঠস্বর অনুধাবন করে কাজ করার ক্ষমতা থাকবে।
  • মানুষের কণ্ঠস্বর শনাক্ত করার ক্ষমতা থাকবে।
  • স্মৃতিধারণক্ষমতা বিস্ময়করভাবে বৃদ্ধি পাবে।
  • চৌম্বক কোর স্মৃতির ব্যবহার থাকতে পারে।
  • বিপুল শক্তিসম্পন্ন সুপার কম্পিউটারের উন্নয়ন ঘটবে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x